শারিরীক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য

স্বাস্থ্যবিজ্ঞান পরিচিতি ও স্বাস্থ্যসেবা | শারিরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য | অষ্টম শ্রেনি

আমাদের দেহকে ঘিরে প্রতিনিয়ত যেসব সমস্যার উদ্ভব হয়, সুন্দর জীবনযাপনের জন্য সেসব সমস্যার সমাধান করতে হয়। এজন্য দৈহিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞানের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়। কারণ, মানবশরীর যেসব প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, তা থেকে ব্যবস্থাবেঁচে থাকার জন্য যথাসময়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

মানুষের জীবন ধ্বংসের জন্য যুগে যুগে বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছে। সচেতন মানবসমাজ তার মোকাবিলা করে সেসব রোগের প্রতিষেধক ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে। ঘাতক ব্যাধি এইডস বর্তমানে সারা বিশ্বে আশঙ্কাজনকভাবে বিস্তার লাভ করে চলেছে। এইডস রোগের কোনো প্রতিষেধক বা সম্পূর্ণরূপে নিরাময় করতে পারে এমন ওষুধ এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। অকালমৃত্যুই এইডস রোগীর শেষ পরিণতি। তাই এইচআইভি ও এইডস কী, কি করলে এ রোগ সংক্রমিত হয়, এ রোগের লক্ষণ, প্রতিরোধের উপায় কী প্রভৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা ও সকলকে সচেতন করা প্রয়োজন।

তো শিক্ষার্থী বন্ধুরা, আজকে আমরা স্বাস্থ্যবিজ্ঞান পরিচিতি ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনা করবো। আশা করি তোমরা আজকের সম্পূর্ন পাঠ আলোচনা পড়বে এবং কিছু শিখার ও জানার চেষ্টা করবে। চলো শুরু করা যাক –

এইচআইভি ও এইডসের ধারণা ও প্রভাব :

বর্তমান বিশ্বে যে কয়েকটি ঘাতক ব্যাধিতে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, তার মধ্যে এইডস (AIDS) একটি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও আর্থ- সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দেশেও এইডস মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার যথেষ্ট আশঙ্কা আছে। তাই, এইডস সম্বন্ধে আমাদের সকলেরই জানা প্রয়োজন। এইডস চারটি ইংরেজি শব্দ, যার পূর্ণরূপ হলো- Acquired Immune Deficiency Syndrome-এর প্রত্যেকটির প্রথম অক্ষর নিয়ে AIDS গঠিত। এইডস এক ধরনের ভাইরাসজনিত রোগ। এই ভাইরাসটির নাম এইচআইভি (HIV), যার পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি রূপ হলো Human Immuno deficiency Virus (HIV) বিভিন্ন উপায়ে এই ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়। এইচআইভি সংক্রমণের ফলে যে রোগ হয় তা হলো এইডস। এর কোনো কার্যকর প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি বলে একে ঘাতক বা মরণব্যাধি বলা হয়।

এইডস কত দিন পর ধরা পরে? 

উত্তর: রোগে আক্রান্ত হওয়ার ২/৩ মাস পর ধরা পরে।  তবে এর আগেও কিছু কিছু লক্ষনীয় কারন থাকে।  সেগুলো পর্যবেক্ষন করে ডাক্তারের পরামর্শ নিলে এ রোগ থেকে সহজেই পরিত্রান পাওয়া যায়। 

AIDS- এর পূর্ণরূপ কি? 

উত্তর : Acquired Immune Deficiency Syndrome.

HIV- এর পূর্ণরূপ কি? 

উত্তর:  Human Immuno deficiency Virus.

রোগের কার্যকর প্রতিষেধক আবিষ্কার না হলে তাকে কি বলে? 

উত্তর : কোনো রোগের কার্যকর প্রতিষেধক আবিষ্কার না হলে   একে ঘাতক বা মরণব্যাধি বলা হয়।

 

এইচআইভি ও এইডস এর প্রভাব এর প্রভাব মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রে বিপর্যয় ডেকে আনে। স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যেমন এইচআইভি ও এইডস এর ক্ষতিকর দিক রয়েছে তেমনি পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এইচআইভি বিস্তারের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে।

সাস্থ্যব্যবস্থার উপর প্রভাব কারো দেহে এইচআইভি ভাইরাস প্রবেশ করলে তা সারাজীবন শরীরের মধ্যে থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক বা তার ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ব্যবহারের মাধ্যমে অন্যের শরীরেও ভাইরাসটি ছড়ায়। স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এটা মারাত্মক হুমকিরূপ। এইডসের কোনো প্রতিষেধক না থাকায় এ রোগে আক্রান্ত হলে রোগী ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। এতে স্বাভাবিক ফাস্থ্যব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

পরিবারের উপর প্রভাব : এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি জীবিত থাকা অবস্থায় তাকে পরিবারের লোকজন, আত্মাীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী সকলেই এড়িয়ে চলে। সে ও তার পরিবারকে সামাজিকভাবে হেয় হতে হয়। তার চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে পরিবারে আর্থিক অনটন দেখা দেয়। এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি মারা গেলে তার ছেলেমেয়েরা এতিম হয়ে অবহেলা-অনাদরে বড় হতে থাকে। তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, এমনকি অর্থাভাবে অনেকের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় ।

অর্থনৈতিক প্রভাব : এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি কর্মরত থাকলে তাকে কাজ বা চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এইডস আক্রান্ত ব্যক্তির কর্মক্ষমতা কমে যায়। ফলে সে ঠিকমত কাজকর্ম বা আয়-রোজগার করতে পারে না। এতে ঐ ব্যক্তির পরিবারের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। যেসব দেশে এইডসের প্রকোপ বেশি, সেখানে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা নেমে আসে।

এইডসের লক্ষণসমূহ :
এইডসের ‘নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ নেই। তবে, এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি অন্য যে রোগে আক্রান্ত হয়, সে লক্ষণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-

এইডস এর লক্ষণ ও কারণ কি কি?

উত্তর:

শরীরের ওজন দ্রুত হ্রাস পাওয়া।

অজানা কারণে দুই মাসের অধিক সময় জ্বর থাকা।

দীর্ঘদিন ধরে শুকনো কাশি থাকা।

দুই মাসের অধিক সময় ধরে পাতলা পায়খানা।

শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ছত্রাকজনিত সংক্রমণ দেখা দেওয়া।

লসিকা গ্রন্থি (Lymph Gland) ফুলে যাওয়া ।

 

এইডস রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় কত মাসে?

উত্তর :  বড় বড় লক্ষণগুলি ২-৩ মাসের মধ্যে দেখা দেয়। তবে প্রথম সপ্তাহ থেকে ছোট ছোট লক্ষণগুলো বিদ্যমান থাকে। 

মহিলাদের মধ্যে এইচআইভি লক্ষণ কি?

এইডস আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাধারণত উপরে বর্ণিত একাধিক লক্ষণ দেখা যেতে পারে। এ জন্য তার এইডস হয়েছে নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া যাবে না। তবে কোনো ব্যক্তির এসব লক্ষণ দেখা দিলে বিলম্ব না করে অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা করে এইচআইভি সংক্রমণের বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে।

 

এইচআইভি ও এইডস সংক্রমণের ঝুঁকি :

বিশ্বে যে কয়েকটি ঘাতক ব্যাধিতে মানুষ অধিক সংখ্যায় আক্রান্ত হচ্ছে এর মধ্যে এইডস অন্যতম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৮১ সালে সর্বপ্রথম এইডস শনাক্ত হয় । এইডস কে আবিষ্কার করেন? বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক বা নিরাময়ব্যবস্থা থাকলেও এইডস সম্পূর্ণরূপে নিরাময় করতে পারে এমন ওষুধ এখনও আবিষ্কার হয় নি। এইডস হলো এইচআইভি ভাইরাস দ্বারা সংক্রমণের সর্বশেষ পর্যায়। এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি অতি সহজেই অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয় এবং কোনো চিকিৎসায় ভালো হয় না।

এইডস হলে কি মানুষ মারা যায়?

উত্তর : সারাবিশ্বে  এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত সাড়ে তিন কোটি (৩৫ মিলিয়ন) মানুষ পরলোক গমন করেছে  এ কথা  জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। যার মধ্যে এই গত বছর মারা গেছে দশ লক্ষ মানব।  আরও তিন কোটি সত্তর লাখ মানব এই রোগে আক্রান্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে । এইচআইভি ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করে দেহের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয় বলে এর একমাত্র পরিণতি মৃত্যু। 

এইচআইভি ও এইডস বিস্তারে বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান : 

এইচআইভি ও এইডস সমগ্র বিশ্বে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এর বিস্তার আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি। পূর্ব ইউরোপ ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে এর দ্রুত বিস্তার ঘটেছে । এশিয়া মহাদেশে ভারত ও মিয়ানমারে এইডসের ব্যাপকতা সবচেয়ে বেশি। চীন, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও নেপালে এর বিস্তার ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে। এইডস আক্রান্ত দেশসমূহে বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক যায়। অনৈতিক জীবনযাপনের ফলে তাদের এইডসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে গিয়েছে। এই সকল শ্রমিকেরা অনেক সময় এইচআইভি ভাইরাস নিজেদের শরীরে বহন করে দেশে ফিরে আসছে। এছাড়া আমাদের দেশে অনিয়ন্ত্রিত মাদকের ব্যবহার, অসচেতনতা, অশিক্ষা, অনৈতিকতা, দারিদ্র্য প্রভৃতি কারণে ২৫ বছরের কম বয়সী কিশোর- কিশোরী/ যুবক-যুবতীদের মধ্যে এইডস সংক্রমণের ব্যাপকতা মহামারী আকারে পৌঁছে গিয়েছে।

অল্প বয়সী মেয়েরা এইচআইভি সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ :

যেহেতু প্রতিকারবিহীন এ রোগের পরিণতি ভয়াবহ, তাই বিশেষ করে অল্প বয়সী মেয়েদেরকে এ বিষয়ে বিশেষভাবে সচেতন হতে হবে এবং সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে । বিভিন্ন দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি থেকে জানা যায় যে নতুন এইচআইভি আক্রান্তদের অর্ধেকই ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী। এই বয়সী মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় অধিক ঝুঁকিতে রয়েছে। এর প্রধান কারণগুলো হচ্ছে—

মহিলাদের মধ্যে এইচআইভি লক্ষণ

  1. বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামোতে মেয়েদের দুর্বল অবস্থান
  2. এইচআইভি ও এইডস সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব
  3. নারী-পুরুষের বৈষম্যের কারণে নারীর নিগৃহীত হওয়া
  4. অনৈতিক ও অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে মেয়েদের বাধাদানের ক্ষমতার অভাব
  5. মেয়েদের বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্ট্য
  6. অনিরাপদ দৈহিক সম্পর্ক ইত্যাদি ।

এইচআইভি ও এইডস প্রতিরোধে করণীয়-

ঘরে বসে এইডস পরীক্ষা

এইচআইভি এইডস রোগ কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়?
উত্তর:

  • অপরীক্ষিত রক্ত গ্রহণ করা যাবে না।
  • অন্যের ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ব্যবহার করা যাবে না।
  • অন্যের ব্যবহৃত ব্লেড বা রেজার ব্যবহার করা যাবে না।
  • অনৈতিক, অনিরাপদ ও অনিয়ন্ত্রিত শারীরিক সম্পর্ক করা যাবে না।
  • অপারেশনে পরিশুদ্ধ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে।
  • শিশুকে এইচআইভি জীবাণুবাহী বা এইডসে আক্রান্ত মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো যাবে না।

এছাড়াও এইচআইভি সংক্রমণের কারণগুলো জেনে এ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে আমরা এইডস প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে পারি।

তো শিক্ষার্থী বন্ধুরা,  আমাদের আজকের এই পাঠ আলোচনা এই পর্যন্তই।  আশা করি তোমরা আজকের পাঠ আলোচনা থেকে অনেক কিছু শিখতে ও জানতে পেরেছো। যা তোমাদর এ রোগ থেকে বেচে থাকতে সাহায্য করবে এবং এ রোগের লক্ষণগুলো তোমাদর চোখে পরবে৷  আবার দেখা হবে নতুন কোন পাঠ আলোচনায়।  সে পর্যন্ত সবাই ভালো ও সুস্থ থাকবে এই কামনাই করি।

আল্লাহ হাফেজ!

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button