বিজ্ঞান সপ্তম শ্রেনী

উদ্ভিদ ও প্রানীর কোষীয় সংগঠন | বিজ্ঞান | দাখিল সপ্তম শ্রেণী

আমাদের চার পাশে অনেক প্রানীর বসবাস।  যাদের প্রত্যেকেরই প্রানী কোষ বিদ্যমান । প্রাকৃতিক পরিবেশে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবদেহ থেকে শুরু করে অতি বৃহদাকার ও উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহের সাংগঠনিক এবং কার্যপ্রণালিতে প্রচুর মিল-অমিল রয়েছে। সকল জীবদেহের মধ্যে সাধারণ মিল বা সাদৃশ্যটি হলো যে, জীবদেহ মাত্রই কোষ দ্বারা গঠিত।

বিগত কয়েকশ বছর ধরে বিজ্ঞানীগণ নিরলস প্রচেষ্টায় কোষের গঠন, আকৃতি, প্রকৃতি ও অন্যান্য বিষয়ে প্রচুর গবেষণামূলক কাজ করেছেন। একটি জীবদেহের সব কোষের গঠন প্রকৃতি এক রকম নয় বরং ভিন্ন। আমরা এ পরিচ্ছেদে কোষের গঠন বর্ণনা করব কিন্তু নিম্নে বর্ণিত সকল অঙ্গাণু এক সাথে এক কোষে পাওয়া যায় না।

তাই মোটামুটি সব ধরনের কোষে যেসব ক্ষুদ্র অঙ্গাণু পরিলক্ষিত হয় সেগুলোকে বর্ণনার জন্য একটি কোষের আওতায় এনে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথম দিকে যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে জীববিজ্ঞানীরা কোষের যে ধারণা পেয়েছিলেন তা ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের পর আরও সুষ্পষ্ট ও বিস্তারিত হয়েছে। সেই আলোকে আদর্শ কোষ নিয়েই আমাদের আজকের এই পাঠ আলোচনা

একটি উদ্ভিদ কোষের বর্ননা :

প্রতিটি জীবদেহ এক বা একাধিক কোষ দিয়ে গঠিত হয়। একটি আদর্শ উদ্ভিদকোষ প্রধানত দুটি খে নিয়ে গঠিত- কোষপ্রাচীর এবং প্রোটোপ্লাজম।

কোষপ্রাচীর : উদ্ভিদকোষের ক্ষেত্রে কোষঝিল্লির বাইরে জড় পদার্থ দিয়ে তৈরি একটি বহু প্রাচীর থাকে, একে কোষপ্রাচীর বলে। এটি সেগুলোজ যারা গঠিত। প্রাণিকোষে এ ধরনের প্রাচীর থাকে না। প্রাণিকোষের আবরণটি প্লাজমা পর্দা দ্বারা গঠিত। কোষের সজীব অংশকে রক্ষা করা এবং কোষের সীমারেখা নির্দেশ ক কোষপ্রাচীরের প্রধান কাজ।

প্রোটোপ্লাজম : প্রোটোপ্লাজম কোষের অর্ধত প্রোটোপ্লাজমের নানাবিধ বিক্রিয়ার ফলে জীবনের বৈশিষ্ট্যগুলো পরিলক্ষিত হয়। এটি বিভিন্ন জৈব ও অজৈব যৌগ সমন্বয়ে গঠিত। প্রোটোপ্লাজমে পানির পরিমাণ সাধারণত শতকরা ৬৭ থেকে ১০ ভাগ।

প্রোটোপ্লাজম কোষের প্রধান দুটি অংশ সাইটোপ্লাজম ও নিউক্লিয়াস ধারণ করে।

সাইটোপ্লাজম: কোষের প্রোটোপ্লাজমের নিউক্লিয়াসের বাহিরে জেলির মতো অংশকে সাইটোপ্লাজম বলে। সাইটোপ্লাজমের অভ্যন্তরে অবস্থিত কোষের বিভিন্ন জৈবনিক ক্রিয়াকলাপের সাথে সংশ্লিষ্ট সজীব কতুসমূহকে একত্রে সাইটোপ্লাজমীয় অঙ্গাণু বলা হয়। একটি আদর্শ কোছে সাধারণত নিম্নলিখিত

অঙ্গাণুগুলো দেখা যায়-

১. প্লাস্টিড, ২. মাইটোকন্ড্রিয়া, ৩. গলজি বডি, ৪. এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা, ৫. রাইবোজোম, ৬. লাইসোজোম ও ৭. সেন্ট্রিওল।

কোষগহ্বর : কোষের সজীব অঙ্গাণু এবং নির্জীব বস্তুসমূহ সাইটোপ্লাজমের ধাত্রে থাকে। উদ্ভিদ কোষের নির্জীব বস্তুসমূহের মধ্যে আছে বিভিন্ন রকমের সঞ্চিত পদার্থ, বর্জ্য পদার্থ ও ক্ষরিত পদার্থ। কোষের সাইটোপ্লাজমে তরল পদার্থপূর্ণ (কোষরস) ছোট-বড় গহ্বর থাকে তাদের কোষগহ্বর বলে। প্রাণিকোষে সাধারণত কোষগহ্বর থাকে না তবে কোনো কোনো কোষে যদি থাকে তা আকারে খুব ছোট। উদ্ভিদকোষে কোষগহ্বর বেশি থাকে এবং আকারে বড় হয়। নানা প্রকার জৈব এসিড, লবণ, শর্করা, আমিষ ইত্যাদি কোষগহ্বরে দ্রবীভূত অবস্থায় থেকে কোষরস প্রস্তুত করে।

কোষ অঙ্গাণুগুলোর পরিচয় :

সাইটোপ্লাজমে সুনির্দিষ্ট আবরণীযুক্ত সজীব বস্তুগুলো কোষ অঙ্গাণু। নিচে এগুলোর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

প্লাস্টিড : সজীব উদ্ভিদকোষের সাইটোপ্লাজমে বর্ণহীন অথবা বর্ণযুক্ত গোলাকার বা ডিম্বাকার অঙ্গাণুকে প্লাস্টিড বলে। সাধারণত প্রাণিকোষে প্লাস্টিড নেই। এ অঙ্গাণুটি উদ্ভিদকোষের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। প্লাস্টিড উদ্ভিদের খাদ্য সংশ্লেষে, বর্ণ গঠনে এবং খাদ্য সঞ্চয়ে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। রঞ্জক পদার্থের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির উপর নির্ভর করে প্লাস্টিডকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ক্রোমোপ্লাস্টিড বা বর্ণযুক্ত প্লাস্টিড এবং লিউকোপ্লাস্টিড বা বর্ণহীন প্লাস্টিড। ক্রোমোপ্লাস্টিড দুই রকম- ক্লোরোপ্লাস্ট ও ক্রোমোপ্লাস্ট। এদের মধ্যে তিনটি অংশ পরিলক্ষিত হয়। যথা- আবরণী, স্ট্রোমা এবং গ্রানা। প্লাস্টিডের মধ্যে ক্লোরোপ্লাস্টে সবুজ বর্ণের ক্লোরোফিল নামক রঞ্জক পদার্থ থাকায় সবুজ বর্ণ ধারণ করে। সালোকসংশ্লেষণে সহায়তা করা এর প্রধান কাজ।

ক্রোমোপ্লাস্ট ফুলের পাপড়ি ও ফলের ত্বকে বিভিন্ন বর্ণবৈচিত্র্য সৃষ্টি করে। সবুজ ফল পাকার সময় ক্লোরোপ্লাস্ট ক্রোমোপ্লাস্টে রূপান্তরিত হয়ে বর্ণবৈচিত্র্য সৃষ্টি করে। টমেটোর যে লাল টকটকে রং দেখ তা এ ক্রোমোপ্লাস্টের লাইকোপেন নামক রঞ্জক পদার্থের জন্য হয়। ক্রোমোপ্লাস্টে লাল, কমলা ও হলুদ বর্ণের ক্যারোটিনয়েড নামক রঞ্জক পদার্থ থাকে।

উদ্ভিদের যেসব অংশে আলো পৌঁছায় না, সেসব অংশের কোষে লিউকোপ্লাস্টিড থাকে। যেমন মূলের কোষের প্লাস্টিড। সূর্যালোকের প্রভাবে এ প্লাস্টিডগুলো রূপান্তরিত হয়ে ক্লোরোপ্লাস্টে পরিণত হয়। তোমরা নিশ্চয় লক্ষ করে থাকবে, যদি সবুজ দুর্বাঘাস ইট দিয়ে কিছুদিন ঢাকা থাকে তবে ঘাসগুলো সাদা হয়ে যায়, কারণ ক্লোরোপ্লাস্টগুলো লিউকোপ্লাস্টে রূপান্তরিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে ইট সরিয়ে নিলে সূর্যের আলোয় ঘাসগুলো আবার সবুজ বর্ণের হয়ে যায়। এতে প্রমাণিত হয় যে এক ধরনের প্লাস্টিড রূপান্তরিত হয়ে অন্য ধরনের প্লাস্টিডে পরিণত হয়।

মাইটোকন্ড্রিয়া : সজীব উদ্ভিদ ও প্রাণিকোষের সাইটোপ্লাজমে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট দণ্ডাকার অঙ্গাণুগুলোকে মাইটোকন্ড্রিয়া বলে (এক বচনে মাইটোকন্ড্রিয়ন) । প্রতিটি মাইটোকন্ড্রিয়ন দ্বিস্তর পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে। এর বহিঃপর্দাটি মসৃণ। কিন্তু অন্তঃপর্দাটি আঙুলের মতো অনেক ভাঁজ সৃষ্টি করে। এদেরকে ক্রিস্টি বলে।

জীবের যাবতীয় বিপাকীয় কাজের শক্তির উৎস হচ্ছে মাইটোকন্ড্রিয়া। এ জন্য মাইটোকন্ড্রিয়াকে কোষের ‘পাওয়ার হাউস’ বলে। সবুজ উদ্ভিদকোষে এর সংখ্যা বেশি তবে প্রাণীর যকৃৎ কোষে এর সংখ্যা সহস্রাধিক।

সেন্ট্রিওল : প্রাণিকোষের নিউক্লিয়াসের কাছে দুটি ফাঁপা নলাকার বা দণ্ডাকার অঙ্গাণু দেখা যায়, তাদের সেন্ট্রিওল বলে, সেন্ট্রিওল সাধারণত একটি স্বচ্ছ দানাবিহীন সাইটোপ্লাজম দ্বারা আবৃত থাকে। এ অংশকে সেন্ট্রোজোম বলে। উদ্ভিদকোষে সেন্ট্রিওল সাধারণত থাকে না, তবে নিম্নশ্রেণির উদ্ভিদকোষে যেমন- ছত্রাকে থাকে। প্রাণিকোষ বিভাজনের সময় অ্যাস্টার গঠন করা সেন্ট্রিওলের প্রধান কাজ।

নিউক্লিয়াস : প্রোটোপ্লাজমে পর্দা দিয়ে বেষ্টিত সর্বাপেক্ষা ঘন কতুকে নিউক্লয়াস বলে। প্রতিটি নিউক্লিয়াস চারটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত হয়- i. নিউক্লিয়ার মেমব্রেন বা নিউক্লিয়ার পর্দা ii. নিউক্লিওলাস iii. নিউক্লিওজালিকা iv. নিউক্লিওপ্লাজম ।

উদ্ভিদটিস্যুর বৈশিষ্ট্য ও কাজ :

জীবদেহ এককোষী অথবা বহুকোষী হতে পারে। যেসব জীবের দেহ একটি কোষ দিয়ে গঠিত তারা এককোষী। একটি মাত্র কোষ দিয়ে এদের পুষ্টি, রেচন, শ্বসন, জনন ইত্যাদি যাবতীয় জৈবিক কাজ সম্পন্ন হয়। বহু কোষ নিয়ে গঠিত জীবদেহকে বহুকোষী জীব বলে। বহুকোষী জীবদেহ গঠনকারী টিস্যুগুলোর মধ্যে একদিকে যেমন শ্রেণিবিন্যাস ঘটে তেমনি অপর দিকে শ্রম বিভাজনও হয়ে থাকে। কারণ যদি সকল কোষ একই সাথে এবং একই রকম ভাবে জৈবিক কার্য সম্পন্ন করত তাহলে জীবদেহের গঠন বৈচিত্র্য এবং শারীরবৃত্তীয় ও জৈবিক কাজগুলোতে নানা রকমের বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। এতে সুষ্ঠ জৈবিক ধারা বজায় থাকত না। সুষ্ঠু জৈবিক ক্রিয়া এবং সুষ্ঠু জীবন ধারা রক্ষায় বিভিন্ন প্রকার কোষ সমবেত ভাবে বা একত্রে কাজ করার জন্য জীবদেহে গুচ্ছাকারে থাকে।

উৎপত্তির দিক থেকে একইরকম কতগুলো কোষ আয়তনে ও আকৃতিতে অভিন্ন বা ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও যদি দলগত ভাবে অবস্থান করে একই ধরনের কাজ করে তখন সেই দলবদ্ধ কোষগুলোকে টিস্যু বলে।

উদ্ভিদটিস্যু:

উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহ বিভিন্ন প্রকার টিস্যু দ্বারা গঠিত। একেক ধরনের টিস্যু একেক ধরনের কাজ সম্পন্ন করে।

বিভাজন ক্ষমতা অনুযাই টিস্যু  দুই রকম,  যেমন –

ক) ভাজক টিস্যু।

খ) স্থায়ী টিস্যু।

প্রাণীটিস্যুর বৈশিষ্ট্য ও কাজ: 

আমরা কীভাবে হাঁটাচলা করি, কীভাবে খাবার খাই, কীভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নেই লক্ষ কর। এ কাজগুলো যেমন আলাদা তেমনি ভিন্ন প্রকৃতির। আমরা পা দিয়ে হাঁটি, হাত দিয়ে লিখি, মুখ দিয়ে খাবার খাই, দাঁত দিয়ে খাবার চিবাই। এ কাজগুলো করে আলাদা আলাদা অঙ্গ। এই অঙ্গগুলোর কোষের গঠন ও কাজ আলাদা। আমাদের দেহের হাড়, মাংস, মস্তিষ্ক ইত্যাদি অনেকগুলো কোষ দিয়ে তৈরি যাদের গঠন ও কাজ ভিন্ন প্রকৃতির।

বহুকোষী প্রাণীতে এভাবে অনেকগুলো কোষ যখন কোনো নির্দিষ্ট কাজ করে তখন ঐ কোষগুলোকে একত্রে টিস্যু (Tissue) বা কলা বলা হয়। এসব কোষের উদ্দেশ্য এক হলেও এদের আকার, আয়তন ও গঠন ভিন্ন হতে পারে। এটা নির্ভর করে টিস্যু ও কোষের কাজের ধরনের উপর। প্রাণিদেহ বিভিন্ন প্রকার টিস্যু দিয়ে গঠিত। টিস্যু সাধারণত চার ধরনের হয়। যথা-

  • ক. আবরণী টিস্য
  • খ. যোজক টিস্য
  • গ. পেশি টিস্যু
  • ঘ. স্নায়ু টিস্যু

 আবরণী টিস্যু বা এপিথিলিয়াল টিস্যু

যে টিস্যু দেহের খোলা অংশ ঢেকে রাখে এবং দেহের ভিতরের আবরণ তৈরি করে তাকে আবরণী কলা বলে। আমাদের ত্বকের বাইরের আবরণ মুখগহ্বরের ভিতরের আবরণ ইত্যাদি আবরণী টিস্যু দিয়ে গঠিত। দেহের বিভিন্ন গ্রন্থিগুলোও আবরণী টিস্যু দিয়ে তৈরি।

আবরণী টিস্যুর বৈশিষ্ট্য: 

• আবরণী টিস্যুগুলো এক, দুই বা অধিক স্তরে সাজানো গুছানো থাকে।

• কোষগুলো একটি পাতলা ভিত্তি পর্দার উপর সাজানো থাকে

• এধরনের কলাতে বা কালগুলিতে  কোনো ধরনেরই আন্তঃকোষীয় ধাত্র (matrix) থাকে না।

পেশি টিস্যু বা মাসকুলার টিস্যু

দেহের কোনো কোনো পেশি আমরা ইচ্ছামত চালনা করতে পারি। যেমন- হাত বা পায়ের পেশি। এ পেশিগুলো আমরা যেভাবে চালাতে চাই সেভাবেই চলে। আবার দেহের কোনো কোনো পেশি আমরা ইচ্ছামতো চালনা করতে পারি না। এ ধরনের পেশি তাদের নিজের ইচ্ছামতো চলে। যেমন- পাকস্থলির পেশি ।

এ আলোচনা থেকে জানলাম পেশি দুই প্রকার। যথা-

১. ঐচ্ছিক পেশি এবং

২. অনৈচ্ছিক পেশি ।

 ঐচ্ছিক পেশি:

আমরা যখন কনুই বাঁকা করি তখন ঊর্ধ্ব বাহুর সামনের দিকের পেশি সংকুচিত হয়ে নিম্ন বাহুকে টেনে বাঁকা করে। যে পেশি আমরা ইচ্ছামতো সংকুচিত ও প্রসারিত করে দেহের বিভিন্ন অঙ্গ সঞ্চালন করতে পারি, তাকে ঐচ্ছিক পেশি বলে। মানবদেহে ঐচ্ছিক পেশির সংখ্যা বেশি। এ পেশি হাড়ের সাথে লেগে থেকে আমাদের অঙ্গ নড়াচড়া করতে সাহায্য করে।

 অনৈচ্ছিক পেশি: 

আমাদের খাদ্য নালিতে খাদ্য পরিবহনের দায়িত্ব পালন করছে অস্ত্রের পেশি। এ ধরনের পেশির উপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। অর্থাৎ যেসব পেশি আমাদের ইচ্ছামতো সংকুচিত হয় না, তাদের অনৈচ্ছিক পেশি বলে। হৃৎপেশি নামে আরেক ধরনের বিশেষ অনৈচ্ছিক পেশি আছে। এ পেশি নিজ ছন্দে পর্যায়ক্রমে সংকুচিত ও স্বাভাবিক হয়ে দেহের রক্ত সঞ্চালন করছে। শুধু হূৎপিন্ড এ পেশি দ্বারা গঠিত।

যোজক টিস্যু বা কানেকটিভ টিস্যু : যোজক টিস্যু প্রাণিদেহের বিভিন্ন টিস্যু এবং অঙ্গের মধ্যে সংযোগ সাধন করে। এই টিস্যু প্রধানত কঠিন, তরল ও মেদময় হয়। যেমন-রক্ত, হাড়, তরুণাস্থি, মেদময় কলা ইত্যাদি যোজক টিস্যুর উদাহরণ।

যোজক কলার কাজ : 

হাড়ের গঠনের একটি প্রধান উপাদান হলো ক্যালসিয়াম। হাড় দেহের কাঠামো গঠন করে, দেহের ভার বহন করে ও দৃঢ়তা দান করে। পেশিবন্ধনী বা টেন্ডন পেশিকে হাড়ের সাথে যুক্ত করে। মেদ কলা স্নেহ পদার্থ সঞ্চিত রাখে। তন্তুময় যোজক টিস্যু ফুসফুস ও রক্তনালির প্রাচীর সংকোচন ও প্রসারণে সাহায্য করে। তরুণাস্থি হাড়ের চেয়ে নরম ও অন্যান্য টিস্যুর চেয়ে বেশি চাপ ও টান সহ্য করতে পারে। যেমন- নাক ও কানের তরুণাস্থি। রক্ত বিভিন্ন দ্রব্যাদি (অক্সিজেন, খাদ্য, রেচন পদার্থ) দেহের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহন করে। এছাড়া রক্ত রোগ জীবাণুর আক্রমণ প্রতিরোধ করে। রক্ত তরল যোজক কলা ।

স্নায়ুটিস্যু বা নার্ভটিস্যু :

প্রাণিদেহের যে কলা উদ্দীপনায় সাড়া দিয়ে উপযুক্ত প্রতিবেদন সৃষ্টি করতে পারে তাকে স্নায়ুটিস্যু বা নার্ভটিস্যু বলে। স্নায়ুটিস্যুর একক হচ্ছে স্নায়ুকোষ বা নিউরন। মস্তিষ্ক অসংখ্য স্নায়ুকোষ বা নিউরন দিয়ে তৈরি। প্রতিটি নিউরন তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। যথা-

  • (ক) কোষদেহ
  • (খ) ডেনড্রন এবং
  • (গ) অ্যাক্সন।

স্নায়ুটিস্যুর কাজ:

দেহের বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ও সংবেদন গ্রহণকারী অঙ্গ থেকে গৃহীত উদ্দীপনা মস্তিষ্কে প্রেরণ করে। দেহের কার্যকর অংশ এ উদ্দীপনায় সাড়া দেয়। যেমন— মশা কামড়ালে এ অনুভূতি মস্তিষ্কে পাঠায়। মস্তিষ্ক হাতকে এ কথা জানায় তখন হাত মশা মারার চেষ্টা করে।উদ্দীপনা বা ঘটনাকে স্মৃতিতে ধারণ করে। দেহের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে।

এ অধ্যায়ের প্রশ্ন ও উত্তর গুলি

                          সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন

১. পেশির কাজ বর্ণনা কর।

উত্তর : পেশির কাজ নিচে বর্ণনা করা হলো-

দেহের আকৃতি দান করে । অস্থি সঞ্চালনে সহায়তা করে । নড়াচড়া ও চলাচলে সাহায্য করে । দেহের ভেতরের অঙ্গগুলোকে রক্ষা করে । হৃৎপেশি দেহের রক্ত সঞ্চালনে সহায়তা করে ।

২. আবরণী টিস্যুর বৈশিষ্ট্য লিখ ।

উত্তর : আবরণী টিস্যুর বৈশিষ্ট্য নিচে দেয়া হলো-আবরণী টিস্যুগুলো এক বা একাধিক স্তরে সাজানো থাকে । এর কোষগুলো একটি পাতলা ভিত্তি পর্দার ওপর সাজানো থাকে । এ ধরনের টিস্যুতে কোনো আন্তঃকোষীয় ধাত্র থাকে না।

৩. নিউক্লিয়াসের গঠন বর্ণনা কর।

উত্তর : নিউক্লিয়াস চারটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত হয় । যথা- i. নিউক্লিয়ার পর্দা

ii. নিউক্লিওলাস

iii. নিউক্লিওজালিকা বা ক্রোমাটিন তন্তু

iv. নিউক্লিওপ্লাজম

৪. প্লাস্টিডের কাজ উল্লেখ কর।

উত্তর : সজীব উদ্ভিদ কোষের সাইটোপ্লাজমে বর্ণহীন অথবা বর্ণযুক্ত গোলাকার বা ডিম্বাকার অঙ্গাণুকে প্লাস্টিড বলে । প্লাস্টিড উদ্ভিদের খাদ্য সংশ্লেষণ, বর্ণ গঠন এবং খাদ্য সঞ্চয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

৫. মাইটোকন্ড্রিয়ার গঠন বর্ণনা কর।

উত্তর : সজীব উদ্ভিদ ও প্রাণী কোষের সাইটোপ্লাজমে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট দণ্ডের আকারের অঙ্গাণুকে মাইটোকন্ড্রিয়া বলে । প্রতিটি মাইটোকন্ড্রিয়া দ্বিস্তর পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে। এর বহিঃপর্দাটি মসৃণ। কিন্তু অন্তঃপদাটি আঙুলের মতো অনেক ভাঁজ সৃষ্টি করে। জীবের যাবতীয় বিপাকীয় কাজের শক্তির উৎস হচ্ছে মাইটোকন্ড্রিয়া। এজন্য একে কোষের ‘পাওয়ার হাউস’ বলে ।

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন 

১. ভাজক কোষে অনুপস্থিত কোনটি?

  • ক.কোষ প্রাচীর
  • খ. নিউক্লিয়াস
  • গ. কোষ গহব্বর ✅
  • ঘ. সেলুলোজ

২. কোষ গহব্বরে বিদ্যমান থাকে –

  • i.   জৈব এসিড ও লবন
  • ii.  আমিষ ও শর্করা
  • iii. অজৈব এসিড ও জৈব এসিড

নিচের কোনটি বা কোনগুলি  সঠিক?

  1. ক. i ও ii
  2. খ. i ও iii
  3. গ. ii ও iii
  4. ঘ. i, ii ও iii✅

নিচের উদ্দীপকটি লক্ষ কর এবং ৩ ও ৪ নং প্রশ্নের উত্তর দাও:

৩. উদ্দীপকের A চিন্হিত অংশটির কাজ হচ্ছে –

  • i. দৃঢ়ডা প্রদান করা
  • ii.  চর্বি জমা করা
  • iii. রক্ত কণিকা তৈরী করা

নিচের কোনটি বা কোনগুলি সঠিক?

  1. ক. i
  2. খ. iii
  3. গ. i ও iii
  4. ঘ. i, ii ও iii✅

৪. A ও B এর বৈশিষ্ট্য হলো –

  • i.   এরা যোজক টিস্যু
  • ii.  এরা অক্সিজেন পরিবহন করে
  • iii. এদের প্রদান উপাদান ক্যালসিয়াম

নিচের কোনটি বা কোনগুলি সঠিক?

  1. ক. i
  2. খ. iii
  3. গ. i ও iii
  4. ঘ. i, ii ও iii✅

সৃজনশীল প্রশ্ন 

ক. রক্ত কী?

উত্তর : রক্ত একধরনের ক্ষারীয়, ঈষৎ লবনাক্ত, লাল বর্ণের, তরল যোজক কলা।

খ. আবরণী টিস্যু বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: যে টিস্যু দেহের  উন্মুক্ত  অংশকে  লুকিয়ে বা ঢেকে  রাখে এবং দেহের ভেতরের আবরণ তৈরি করে, তাকে আবরণী টিস্যু বলে। আমাদের ত্বকের বাইরের আবরণ, মুখগহ্বরের ভেতরের আবরণ ইত্যাদি আবরণী টিস্যু দিয়ে গঠিত। এমনকি বিভিন্ন গ্রন্থিগুলোও আবরণী টিস্যু দ্বারা তৈরি ।

গ. P চিত্রে অস্থির গুরুত্ব ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : P চিত্রের অস্থির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা হলো-

P চিত্রটি একটি হাতের ছবি। যার দ্বারা আমরা অনেক কাজ করে থাকি। এটি অস্থি ও পেশির সমন্বয়ে গঠিত। হাড় সাধারণত দেহের কাঠামো গঠন করে। হাড় গঠনের একটি প্রধান উপাদান হলো ক্যালসিয়াম, পেশি বন্ধনী, পেশিকে হাড়ের সাথে যুক্ত করে, মেদ টিস্যু স্নেহ পদার্থ সঞ্চিত রাখে। তন্তুময় যোজক টিস্যু ফুসফুস ও রক্তনালীর প্রাচীর সংকোচন ও প্রসারণে সাহায্য করে। সুতরাং এই P অস্থির সাহায্যে আমরা খাদ্য খাই ও অন্যান্য কাজ করে থাকি যার কারণে দেহ শক্তি পায় ও দেহকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে ।

ঘ. P ও Q চিত্রের পেশীর টিস্যুর তুলনামূলক পার্থক্য কর।

উত্তর : চিত্রে P ও Q দুটি ঐচ্ছিক পেশি। কারন-

যে পেশি আমরা ইচ্ছামত সংকুচিত ও প্রসারিত করে দেহের বিভিন্ন অঙ্গকে সঞ্চালন করতে পারি, তাকে ঐচ্ছিক পেশি বলে । একমাত্র হৃদ-পেশি ছাড়া আর সব পেশিই ঐচ্ছিক পেশি দ্বারা গঠিত । চিত্রে P হলো একটি হাত যা আমরা ইচ্ছামত চালনা করতে পারি । সুতরাং P চিত্রটি হলো ঐচ্ছিক পেশি ।

আবার Q চিত্রটি হলো একটি পাকস্থলী । হাত দিয়ে আমরা খাদ্য খাওয়ার পর তা পাকস্থলীতে গিয়ে জমা হয়ে পরিপাক হয়ে এর ভেতর দিয়ে বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশন হয়। আমরা শ্বাস প্রশ্বাসের সাহায্যে পাকস্থলীকে সংকুচিত বা প্রসারিত করতে সক্ষম বিধায় • Q চিত্রটিও একটি ঐচ্ছিক পেশি । । _____ সুতরাং P ও Q উভয়ই ঐচ্ছিক পেশি ।

ক. কোষ প্রাচীর কী?

উত্তর : কোষ ঝিল্লীর বাইরে জড় পদার্থ দিয়ে তৈরী একটি পুরু প্রাচীর থাকে।  একে কোষ প্রাচীর বলে৷

খ. মাইটোকন্ড্রিয়াকে শক্তিঘর বলা হয় কেন?

উত্তর : সজীব উদ্ভিদ ও প্রাণী কোষের সাইটোপ্লাজমে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট দণ্ডের আকারের অঙ্গাণুগুলোকে মাইটোকন্ড্রিয়া বলে । জীবের যাবতীয় বিপাকীয় কাজের শক্তির উৎস হচ্ছে মাইটোকন্ড্রিয়া। তাই মাইটোকন্ড্রিয়াকে কোষের শক্তিঘর বলা হয় ।

গ. চিত্র N মূল হওয়া স্বত্তেও বর্ণময় কেন? ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : চিত্র N একটি মূল। আমরা জানি, মূল সাধারণত মাটির নিচে অবস্থান করে। কিন্তু N মূলটির কিছু অংশ মাটির নিচে ও কিছু অংশ মাটির ওপরে অবস্থান করে । প্রতিটি সবুজ উদ্ভিদে প্লাস্টিড নামক এক প্রকার রঞ্জক পদার্থ থাকে। প্লাস্টিড দুই প্রকার – ক্লোরোপ্লাস্ট ও ক্রোমোপ্লাস্ট।

ক্রোমোপ্লাস্ট ফুলের পাঁপড়ি ও ফলের গায়ে বিভিন্ন বর্ণ বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে । আর এ বর্ণবৈচিত্র্য হয় ক্রোমোপ্লাস্টের লাইকোপেন নামক রঞ্জক পদার্থের কারণে । আর উদ্ভিদের যেসব অংশে আলো পৌঁছায় না। সেসব অংশের কোষে লিউকোপ্লাস্টিড থাকে। যেমন N মূলের কোষের প্লাস্টিড সূর্যালোকের প্রভাবে এ প্লাস্টিডগুলো রূপান্তরন হয়ে ক্লোরোপ্লাস্টে পরিণত হয়। আর এই ক্লোরোপ্লাস্ট-ই /বর্ণময় তৈরি করে। তাই N মূল হওয়া সত্ত্বেও বর্ণময়।

ঘ. চিত্র M এর টবে ঢাকা উদ্ভিদটিতে ৮-১০ দিন পর যে পরিবর্তন ঘটবে তা বিশ্লেষণ কর।  

উত্তর : চিত্রের M উদ্ভিদটি ঢাকা অবস্থায় আছে । আমরা জানি, ঢেকে রাখলে সেখানে সূর্যালোক প্রবেশ করতে পারে না । সুতরাং M উদ্ভিদটিতেও আলো পৌঁছাবে না । উদ্ভিদে সাধারণত ক্লোরোফিল নামক রঞ্জক পদার্থ থাকার কারণে সবুজ দেখায়।

যেহেতু ৮-১০ দিন ঢেকে রাখার পর উদ্ভিদটির ক্লোরোপ্লাস্টগুলো ধীরে ধীরে লিউকোপ্লাস্টে পরিণত হবে। কারণ যেখানে সূর্যালোক প্রবেশ করতে পারে না সেখানে লিউকোপ্লাস্টিড অবস্থান করে। তাই উদ্ভিদটির এ পরিবর্তন পরিলক্ষিত হবে । পরবর্তীতে ঢাকনা সরিয়ে দিলে সূর্যের আলোয় উদ্ভিদটি আবার সবুজ বর্ণের হয়ে যাবে । এতে প্রমাণিত হয় যে, এক ধরনের প্লাস্টিড রূপান্তরিত হয়ে অন্য ধরনের প্লাস্টিডে পরিণত হয় ।

তো শিক্ষার্থী বন্ধুরা, আমাদের আজকের এই পাঠ আলোচনা এ পর্যন্তই।  আমরা তোমাদেরকে সকল পাঠ গুলি সহজ, সঠিক ও নির্ভুল উপায়ে আয়ত্ত করার মাধ্যম শিখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। যাতে করে তোমরা সহজেই তোমাদের পরীক্ষায় উত্তর করতে পারো। আবার দেখা হবে নতুন কোন পাঠ আলোচনায় সে পর্যন্ত তোমার সকলেই ভালো ও সুস্থ থাকবে এই কামনাই করি।

আল্লাহ হাফেজ!

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button