শারিরীক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য

শরীরচর্চা ও সুস্থ জীবন | শারিরীক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য | অষ্টম শ্রেনী

আমরা সকলেই চাই আমরা যেন সব সময় সুস্থ থাকি । সুখী ও সুন্দর জীবনের জন্য প্রয়োজন শারীরিক সুস্থতা। শারীরিক সক্ষমতা অর্জনের জন্য আমরা নানা ধরনের ব্যায়াম করে থাকি। ব্যায়াম একাকী বা দলগতভাবে করা যায়। ব্যায়াম করার ফলে দেহ ও মনের উন্নয়ন সাধিত হয়। প্রতিদিন নিয়মিত ও পরিমিত ব্যায়াম করলে দেহ কাঠামো সুদৃঢ় ও সবল হয়। তবে একটানা ব্যায়াম করলে শরীরের জীবকোষগুলো ক্ষয়পূরণ করার সময় পায় না।

তখন আমরা অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়ি। এই ক্ষয়পূরণ এবং কর্মোদ্যম পুনরুজ্জীবিত করার জন্য পূর্ণ বিশ্রামের প্রয়োজন। বিশ্রাম করলে ক্ষয়প্রাপ্ত জীবকোষগুলো পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে এবং শরীরের ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদ দূর হয় । ঘুম আমাদের শরীর ও মনকে বিশ্রাম দেয়। প্রকৃতপক্ষে ঘুম আমাদের মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয়। ভালো ঘুম হলে শরীর ও মন সতেজ থাকে।

শারীরিক সুস্থতার জন্য আমরা সরঞ্জামবিহীন ও সরঞ্জামসহ বিভিন্ন প্রকার ব্যায়াম করি। এছাড়া আমরা বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগীতির মাধ্যমে শারীরিক কসরত করে থাকি। ব্রতচারী নৃত্য শারীরিক কসরতের একটি অন্যতম উদাহরণ। খেলোয়াড়দের এই ধরনের শারীরিক কসরতের মাধ্যমে শারীরিক সুস্থতার সাথে সাথে আনন্দ ও চিত্তবিনোদনের সুযোগ ঘটে । তো শিক্ষার্থী বন্ধুরা আমরা আজকে আলোচনা করবো তোমাদের শারিরীক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বইয়ের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় “শরীরচর্চা ও সুস্থ জীবন” নিয়ে।  আশা করি তোমরা সম্পূর্ণ পাঠ আলোচনা পড়বে এবং কিছু শেখার চেষ্টা করবে। তো চলো শুরু করা যাক-

সুস্থ জীবনের জন্য শারীরিক
শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কি?
শারীরিক শিক্ষার
প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা কর।

শারীরিক সুস্থতায় ব্যায়ামের প্রভাব : শারীরিক সুস্থতার প্রধান বাহন হলো ব্যায়াম। ব্যায়াম ছাড়া একজন মানুষের শারীরিক সুস্থতা আশা করা যায় না। ব্যায়াম ও খেলাধুলা শুধু দেহের বৃদ্ধি ঘটায় না, মনেরও উন্নতি সাধন করে। দেহ ভালো থাকলে মন ও ভালো থাকে। কারণ মন ছাড়া দেহ এককভাবে চলতে পারে না, দেহ হচ্ছে মনের আধার। তাই, সুস্থ দেহে সুন্দর মন’-এটি প্রতিষ্ঠিত প্রবাদ হিসাবে সমাজে স্বীকৃত। শরীরচর্চায় দেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উন্নতি হয়। কিন্তু মনের উন্নতি কীভাবে হয় তা জানা প্রয়োজন। মনস্তত্ত্ব একটি বিজ্ঞান। এর কাজ হচ্ছে মনকে নিয়ে। মন কাজ করে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে অর্থাৎ মস্তিষ্ক দ্বারা ।

প্রতিটি মানুষের দেহের মধ্যেই অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ রয়েছে। যেমন- হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক ফুসফুস, যকৃৎ, বৃক্ক, পাকস্থলী, অগ্ন্যাশয়, মেরুমজ্জা প্রভৃতি। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মস্তিষ্ক। দেহের বিভিন্ন তন্ত্র নিজ নিজ ক্ষেত্র মোতাবেক কাজ করে, তবে এদের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে দেহ অচল হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সাহায্যে দেহের সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজের সমন্বয় সাধিত হয়। ব্যায়াম এ সকল অঙ্গের সুষম উন্নতি সাধন করে। তবে এই সকল ব্যায়ামের কার্যক্রম বয়স ও লিঙ্গভেদে নির্দিষ্ট সময়ে ও মাত্রায় পরিচালনা করতে হয়। শিশুর দৈহিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বৃদ্ধির সাথে সাথে শরীরচর্চা বা ব্যায়ামের কর্মসূচিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ব্যায়ামের কর্মসূচি সহজ থেকে ক্রমশই কঠিন হবে এবং ক্রমাগত উন্নততর হবে।

সরঞ্জামবিহীন ব্যায়াম : সরঞ্জাম ছাড়া যে সমস্ত ব্যায়াম করা হয়, তাকে সরঞ্জামবিহীন ব্যায়াম বলে। আমরা জিমন্যাস্টিকের ভাষায় ‘ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ’ বা খালি হাতের ব্যায়াম বলি। নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সরঞ্জাম নিয়ে ব্যায়াম করা হয়।

স্পিড এক্সারসাইজ কাকে বলে?
উত্তর : শরীরের গতি বৃদ্ধির জন্য যে ব্যায়াম করা হয় তাকে স্পিড এক্সারসাইজ বলে।
এবডোমিনাল এক্সারসাইজ বলতে কি বোঝায়?
উত্তর : এবডোমিনাল এক্সারসাইজ বলতে তলপেটের ব্যায়াম করাকে বোঝায়।

হ্যান্ড স্ট্যান্ড এবং হেড স্ট্যান্ড : এ দুটো ব্যায়ামই ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজের ভিতর পড়ে। এ ব্যায়াম করতে কোনো সরঞ্জাম লাগে না। মাটিতেই এ ব্যায়াম করা যায়।

এডুকেশনাল জিমন্যাস্টিকস : ম্যাট বা গদির উপর যুক্ত হাতে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যায়াম করাকে এডুকেশনাল জিমন্যাস্টিকস বা শিক্ষামূলক জিমন্যাস্টিকস বলা হয়। শিক্ষার্থীদের বয়স ও লিঙ্গভেদে এ ধরনের ব্যায়ামের কর্মসূচি নির্ধারণ করে অনুশীলন করাতে হয়। এ ধরনের ব্যায়ামের আগে শরীরকে ভালোভাবে গরম করে নিতে হয়। ব্যায়াম শুরু করার পূর্বে মাঠ এবং সরঞ্জামগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে যাতে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা না থাকে। একজন সাহায্যকারী রাখতে হবে যেন অনুশীলন করার সময় দুর্ঘটনা না ঘটে।

সরঞ্জামসহ ব্যায়াম : যেকোনো উদ্দেশ্য সামনে রেখে সরঞ্জাম নিয়ে ব্যায়াম করাকে সরঞ্জামসহ ব্যায়াম বলে। যেমন- ক্লাইম্বিং রোপ, রোমান রিং, ফ্রিজবি, বল পাসিং, বল নিয়ন্ত্রণ, সাইক্লিং ইত্যাদি।

ক্লাইম্বিং রোপ কি?
উত্তর : দড়ি বা রশি বেয়ে উপরে উঠাই হলো ক্লাইম্বিং রোপ ।

বিশ্রাম, ঘুম ও বিনোদনের প্রয়োজনীয়তা : শরীর সুস্থ না থাকলে মন ভালো থাকে না। ফলে কোনো কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পূর্ণ করা যায় না। কোনো কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন এবং স্বাচ্ছন্দে জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজন নিজেকে সুস্থ রাখা। শুধু ব্যায়াম করলেই শরীর সুস্থ রাখা যায় না। আমাদের দেহে খাদ্য ও পানির যেমন প্রয়োজন তেমনি বিশ্রাম ও ঘুমেরও প্রয়োজন রয়েছে। শরীর সুস্থ রাখার জন্য ব্যায়ামের পর শরীর ও মনের বিশ্রাম এবং ঘুমের প্রয়োজন। চলাফেরা, কাজকর্ম ও ব্যায়ামের পর শরীর পরিশ্রান্ত হয়, শরীরের জীবকোষগুলো ক্ষয় হতে থাকে। তখন আমরা অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়ি। শরীরের জীবকোষগুলোর ক্ষয়পুরণ ও পূর্বাবস্থায় ফিরে আসার জন্য বিশ্রামের প্রয়োজন। বিশ্রামে শরীরের ক্লান্তি ও অবসাদ দূর হয়। বিশ্রাম ও ঘুমের পরিবেশ শান্ত ও নির্জন হলে ভালো ঘুম হবে এবং দেহ ও মনের বিকাশ অব্যাহত থাকবে। ঘুমের সময় দেহের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্থির হয়ে পূর্ণ বিশ্রামে থাকে এবং শ্বাসপ্রশ্বাস ও হজমশক্তির কাজ সুশৃঙ্খলভাবে চলতে থাকে। বিশ্রাম ও ঘুমের পাশাপাশি শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য বিনোদনও একটি মাধ্যম।

যখন কোনো ব্যক্তি স্বতস্ফূর্তভাবে আনন্দ সহকারে তার সময় কাটায় তাকে চিত্তবিনোদন বলে। খেলাধুলা চিত্তবিনোদনের একটি মাধ্যম। খেলাধুলার মাধ্যমে চিত্তবিনোদন ছাড়াও সমাজে আরও বহু ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা আছে। যেমন— ভ্রমনের মাধ্যমে বিনোদন, সিনেমা, টিভি, নাটক উপভোগের মাধ্যমে বিনোদন, বনভোজনের মাধ্যমে বিনোদন, বই পড়ার মাধ্যমে বিনোদন, গল্প করার মাধ্যমে বিনোদন ইত্যাদি। সমাজে বসবাসরত মানুষের আগ্রহ ও চিন্তাধারা ভিন্ন হওয়ায় বিনোদনের ধারাও ভিন্ন। যে বিনোদনের মাধ্যমে কিছু শেখা যায়, তাকে শিক্ষামূলক বিনোদন বলে।
যার মধ্যে অন্যতম হলো:
১. শিক্ষামূলক গ্রন্থাবলী বই
২. টিভি ও কম্পিউটারের অনুষ্ঠানের মাধ্যম
৩. আবৃতি ও সঙ্গীত
৪. ভ্রমণ

চিত্তবিনোদন কাকে বলে?
উত্তর: যখন কোনো ব্যক্তি স্বতস্ফূর্তভাবে আনন্দ সহকারে তার সময় কাটায় তাকে চিত্তবিনোদন বলে।

শিক্ষামূলক বিনোদন কাকে বলে?
উত্তর: যে বিনোদনের মাধ্যমে কিছু শেখা যায়, তাকে শিক্ষামূলক বিনোদন বলে।

বয়স ও শারীরিক গঠন অনুসারে বিশ্রাম ও ঘুমের চাহিদা :

বয়স ও শারীরিক গঠনের উপর বিশ্বা ও ঘুমের চাহিদার তারতম্য হয়ে থাকে। যারা শিশু, তাদের ঘুমের চাহিদা একরকম। যারা কিশোর, তাদের বিশ্রাম ও ঘুমের চাহিদা ভিন্নতর। এভাবে যুবক ও বয়স্কদের বিশ্রাম শৈশবকাল হচ্ছে শিশুর বেড়ে উঠার সময়। এ সময় শিশু যেমন শারীরিকভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, তেমনি মানসিক বিকাশও ঘটে, যা তাকে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করে তোলে। শিশুকে খেলাধুলা করার সুযোগ করে দিতে হবে। খেলাধুলা করার পর কিছু সময় বিশ্রাম নিলে শারীরিক ক্লান্তি দূর হয়। যে সমস্ত শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি বেশি, তারা অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এদের ঘুমের প্রয়োজন হয় বেশি। সাধারণত ৯-১০ ঘণ্টা ঘুমাতে পারলে একটি শিশুর সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয় । বয়স অনুসারে নিচে ঘুমানোর একটি চার্ট দেওয়া হলো-

  • ৫ থেকে ৭ বছর বয়স পর্যন্ত ঘুমের প্রয়োজন ১০-১১ ঘণ্টা ।
  • ৮ থেকে ১১ বছর বয়স পর্যন্ত ঘুমের প্রয়োজন ৯-১০ ঘণ্টা।
  • ১২ থেকে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত ঘুমের প্রয়োজন ৮-৯ ঘণ্টা।
  • ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স পর্যন্ত ঘুমের প্রয়োজন ৬-৮ ঘণ্টা।

উপরোক্ত চার্ট অনুযায়ী সময়মতো ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

সবচেয়ে বেশী ঘুম প্রয়োজন হয় কাদের?
উত্তর : শিশুদের।
শারীরিক সুস্থতার প্রধান ভাব কোনটি?
উত্তর: প্রাত্যহিক ব্যায়াম।
সুস্থ দেহে সুন্দর মন উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।
যত ব্যাধির বালাই বলবে পালাই পালাই - কীভাবে? ব্যাখ্যা কর।
প্রাত্যহিক ব্যায়ামকে কার্যকর করতে প্রধান ভূমিকা পালন করে কোনগুলো?
উত্তর : বিশ্রাম ও ঘুম।

তো শিক্ষার্থী বন্ধু আমাদের আজকের পাঠ আলোচনা এই পর্যন্তই। আশা করি তোমরা আজকের পাঠ আলোচনা থেকে অনেক কিছু শিখতে, জানতে ও বুজতে সক্ষম হয়েছো। যা তোমাদেরকে পরীক্ষায় উত্তর করতে সাহায্য করবে এবং তোমাদের দৈনিক জীবনে সুস্থ থাকার জন্য অত্যাধিক ভূমিকা পালন করবে। আবার দেখা হবে নতুন কোন পাঠ আলোচনায়। সে পর্যন্ত সবাই ভালো ও সুস্থ থাকবে এই কামনাই করি।
আল্লাহ হাফেজ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button