বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

বাংলাদেশের দুর্যোগ | বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় | অষ্টম শ্রেনি

পৃথিবীর নানান যায়গায় নানান ধরনের দুর্যোগ দেখা দেয়। আর এশিয়ার দেশগুলোতে যা প্রায়শই দেখা যায়। এর মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশ। তোমরা  জানো যে, ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা উষ্ণায়নের কারণে সারা পৃথিবীতেই আজ জলবায়ুর পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। জলবায়ুর এই পরিবর্তনের ফলে উষ্ণমণ্ডলীয় দেশে শুষ্ক মৌসুমে ফসলের উৎপাদন হ্রাস পায়। এছাড়া বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

শুষ্ক মৌসুমে অনাবৃষ্টি ও অত্যধিক খরা, শিলাবৃষ্টি, ভূমিক্ষয়, টর্নেডো, সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। শীত মৌসুমে হঠাৎ শৈত্য ও উষ্ণ প্রবাহ এবং ঘন কুয়াশা লক্ষ করা যায়। এ ছাড়া এ দেশে সংগঠিত প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহের মধ্যে ভূমিকম্প অন্যতম।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এ দুর্যোগ সংগঠনের কারণ । বাংলাদেশের জীবন ও অর্থনীতির উপর এইসব দুর্যোগের প্রভাব লক্ষ করা যায় ৷ বিভিন্ন ধরনের প্রকৃতি দুর্যোগ সম্পর্কেই আমাদের আজকের এই পাঠ আলোচনা।  আশা করি তোমরা সম্পূর্ণ পাঠ আলোচনা পরবে এবং এর থেকে কিছু বোঝার ও শেখার চেষ্টা করবে৷ তো চলো শুরু করা যাক-

দুর্যোগ কাকে বলে?

উত্তর : দুর্যোগ  এমন ধরনের আশংকাজনক  সমস্যা যা অল্প বা অনেক সময়ের জন্য হয় এবং ব্যাপক মানবিক, বস্তুগত, অর্থনৈতিক বা পরিবেশগত বিভিন্ন কিছু নষ্ট বা ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে। যা ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় বা জাতির সমন্বয়  সম্পদকে একসাথে করেও মোকাবেলা করার  উপায় থাকে না।

বাংলাদেশের প্রধান দুর্যোগ কি?

উত্তর: বাংলাদেশে যে কয়েকটা  প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেখা যায় তার মধ্যে বন্যার অধিকাংশ  । বাংলাদেশের মানুষের কাছে বন্যা যেমন ক্ষতিকর ঠিক তেমনি অর্থনৈতিক অবস্থার উপর অত্যন্ত বেশী প্রভাব ফেলায় । আসল দিক দিয়ে এ দেশের অবস্থা বিবেচনায় কোনো এলাকা বন্যার পানিতে ডুবে গিয়ে  যদি মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষতিসাধন হয় তবেই একে বন্যা হয়েছে বলে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশ হলো একটি নদীমাতৃক ও বৃষ্টিবহুল দেশ। যার কারনে প্রতি বছরই বন্যা দেখা যায়।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ধারণা

পৃথিবীর বুকে উদ্ভিদ ও প্রাণীর উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে পানি, বায়ু ও অন্যান্য উপাদানের সমন্বয়ে গড়ে উঠা প্রাণ-উপযোগী পরিবেশের কারণে। উষ্ণায়নের ফলে সেই পরিবেশই ভয়ানকভাবে বিপন্ন হচ্ছে। এখন জানা যাক, এই ‘উষ্ণায়ন’ কী। বিজ্ঞানের বিষ্ময়কর অগ্রগতির মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষ একদিকে যেমন তার জীবনকে করেছে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় অন্যদিকে তেমনি পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশকে করেছে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভারসাম্যহীন।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কি?

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কাকে বলে?

উত্তর : পৃথিবীর সাধারণ  তাপমাত্রা তা  অন্যরকম   বেড়ে যাওয়াকে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বলে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে আবহাওয়ায় অনেক পরিবর্তন ঘটছে। যেমন— আগের তুলনায় বাংলাদেশে  শীত অনেক কম পরে। আর  বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্যই বিশ্বের জলবায়ুও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। 

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণ ও প্রভাব

বায়ুর মূল উপাদান হলো নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন। এছাড়া বায়ুতে সামান্য পরিমাণে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড আছে। আরও আছে জলীয় বাষ্প ও ওজোন গ্যাস । বায়ুমণ্ডলের এই গৌণ গ্যাসগুলোকেই গ্রিনহাউস গ্যাস বলা হয়। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এসব গ্যাস ছাড়াও মনুষ্য সৃষ্ট সিএফসি (ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন), এইচসিএফসি (হাইড্রো ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন), হ্যালন ইত্যাদিও গ্রিনহাউস গ্যাস।

গ্রিনহাউস গ্যাস কাকে বলে? 

গ্রিনহাউস গ্যাস কি? 

উত্তর : বায়ুমণ্ডলের এই গৌণ গ্যাসগুলোকেই গ্রিনহাউস গ্যাস বলা হয়।

বিভিন্ন ধরনের প্রকৃতি দুর্যোগ

ভূমিকম্প

পৃথিবীতে যত রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে তার মধ্যে ভূমিকম্পই সবচেয়ে অল্প সময়ে সবচেয়ে বেশি ধ্বংসযজ্ঞ ঘটায়। ভূমিকম্পের ব্যাপারে কোনো আগাম সতর্ক সংকেত দেওয়া সম্ভব নয়। ভূমিকম্পের সময় কিছু বুঝে উঠার আগেই একটি বা কয়েকটি ঝাঁকুনিতে পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। স্থানে সাধ একই স্থানে সাধারণত পর পর কয়েকবার বড়, মাঝারি ও মৃদু ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে। ইরান, চীন, মেক্সিকো, চিলি ও জাপানের ভূমিকম্পে আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি। বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

ভূমিকম্প কি? 

ভূমিকম্প কাকে বলে?

ভূমিকম্প কেন হয়?

উত্তর: ভূ -অভ্যন্তরে শিলায় পীড়নের হওয়ায় একট  একটু করে শক্তির সঞ্চয় হয়,  তারপর সেই শক্তি হঠাৎ করেই মুক্তি পাওয়া মাত্রই ভূ-পৃষ্ঠ ক্ষণিকের জন্য কেঁপে ওঠে এবং ভূ-ত্বকের অনেকাংশই  আন্দোলিত হয়; যার ফলে বিভিন্ন উঁচু দালান ও ধসে পরে।  এইরূপ আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী কম্পনকে ভূমিকম্প বলা হয়। সাধারণ ভাবে বাল যায়  কম্পন-তরঙ্গের মধ্য থেকে যে শক্তি তৈরী হয়, তা এই  ভূমিকম্পের মাধ্যমে প্রকাশ হয়।

সুনামি

সুনামি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের নাম। এটি মূলত জাপানি শব্দ । যার অর্থ হলো ‘সমুদ্র তীরের ঢেউ’। সমুদ্রের তলদেশে প্রচণ্ড ভূমিকম্প বা অগ্ন্যুৎপাতের ফলে, কিংবা অন্য কোনো কারণে, ভূআলোড়নের সৃষ্টি হলে বিস্তৃত এলাকা জুড়ে প্রবল ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। এই প্রবল ঢেউ উপকূলে এসে তীব্র বেগে আছড়ে পড়ে। এই সামুদ্রিক ঢেউয়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ৮০০ পর্যন্ত থেকে ১৩০০ কিলোমিটার হতে পারে। সুনামির কারণে সমুদ্রের পানি জলোচ্ছ্বাসের আকারে ভয়ঙ্কর গতিতে উপকূলের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে। এর ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই উপকূলের ঘর-বাড়ি, দালান, রেলপথ, রাস্তাঘাট, বৈদ্যুতিক যোগাযোগ-ব্যবস্থা, বাণিজ্য কেন্দ্র প্রভৃতি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

সুনামি কি?

সুনামি কেন হয়? 

সুনামি কাকে বলে?

উত্তর : সুনামির হওয়ার প্রধান ও একমাত্র কারণটি হলো  সমুদ্র নিচের দিকে প্রবল ভূমিকম্প বা টেকটনিক প্লেটের বিচ্যুতি। ভুমিকম্পের হলে মাটির কম্পন সংলগ্ন পানিতেও তরঙ্গায়িত হয় এবং আর সেই তরঙ্গ উচু ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলীয় অঞ্চলে আছড়ে পড়ে। এরকম উচু ঢেউকেই বলা হয় সুনামি ।

ভূমিধস

পাহাড়ের মাটি ধসে পরাকেই ভূমিধস বলা হয়। যেসব পাহাড় বেলে পাথর বা শেল কাদা দিয়ে গঠিত ভারি বৃষ্টিপাত হলে সেসব পাহাড়ে ভূমিধস ঘটতে পারে। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ও ভারি বৃষ্টিপাতের কারণেই ভূমিধস ঘটে থাকে । তাছাড়া মানুষ ব্যাপকহারে গাছপালা ও পাহাড় কেটে ভূমিধসের কারণ ঘটায়। ভূমিধসের ফলে যারা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করে তাদের ঘরবাড়ি মাটির নিচে চাপা পড়তে পারে। আমাদের দেশে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, সিলেট, নেত্রকোনা প্রভৃতি জেলায় প্রায়ই ভূমিধস হয়ে মানুষের প্রাণহানি ঘটে ও বাড়িঘর নষ্ট হয়।

ভূমিধস কি?

ভূমিধস কাকে বলে?

ভূমিধস কেন হয়?

উত্তর: পাহাড়ের মাটি ধসে পরাকেই ভূমিধস বলা হয়।  পাহাড়-পর্বতের ওপর থেকে মাটির বা পাথরের খণ্ড বিরাট মাধ্যাকর্ষণ এর টানে নীচে পড়লে তাকে ভূমিধস বলে। কখনো কখনো পাহাড়ের ওপর দিক থেকে নিচের দিকে জল ও মাটি মিশে কাদা আকারে অত্যাধিক পরিমাণে নিচের দিকে  নেমে আসলে তাকেও এক ধরনের ভূমিধ্বস বলে বিবেচনা করা হয়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ সমূহ

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মূলত প্রাকৃতিক কারণে ঘটে থাকে। একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ুগত প্রভাব, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন তথা সামগ্রিক প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে এ দুর্যোগ ঘটে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু, ভূমির গঠন, নদী-নালা ইত্যাদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ হিসাবে বিবেচনা করা যায় ।

ভৌগোলিক অবস্থান : ভৌগোলিক অবস্থানই আমাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগের অন্যতম কারণ নদীমাতৃক প্রায় সমতল এদেশটির উত্তরে হিমালয় পর্বত এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এ দেশে মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীসমূহের উৎস হয় ভারতে না হয় নেপালে। দক্ষিণাঞ্চলে পাহাড়, পর্ব টিলা বা এমন কোনো প্রাকৃতিক বাধা নেই যা ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে স্বাভাবিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।

ভূমির গঠন : বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূভাগ প্লাবন সমভূমি দ্বারা গঠিত। এছাড়া ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার প্লেটের (পৃথিবীর অভ্যন্তরে বিদ্যমান বিশাল পাত) সীমানার কাছে অবস্থিত হওয়ায় এদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত ।

জলবায়ু : বাংলাদেশ ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে অবস্থান করায় এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এর ফলে এখানে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে ।

নদী-নালা : বাংলাদেশের উপর দিয়ে অসংখ্য নদী-নালা আঁকাবাঁকা হয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এখানে বন্যা ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে।

প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারন কি?

উত্তর: আমাদের চারপাশের পরিবেশ দূষিত হলে বৈশ্বিক  জলবায়ু পরিবর্তনের হয়৷  যার ফলে  বিশ্বের  অনেক দেশেই এরকম প্রাকৃতিক  দূর্যোগ দেখা যায়। তবে শতকরা ২০-২৫ শতাংশ  জলবায়ু পাল্টালে হয়।  এছাড়াও দূর্যোগ প্রাকৃতিক কারণেও  হতে পারে। তবে বেশিরভাগ পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের  নিজ হাতে তৈরী। অবিজ্ঞরা বলতেছে, জলবায়ু এরকম হঠাৎ পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী হচ্ছে শিল্পোন্নত দেশগুলােই ।

তো শিক্ষার্থী বন্ধুরা,  আমাদের আজকের পাঠ আলোচনা এই পর্যন্তই। আশা করি তোমরা আজকের পাঠ আলোচনা সম্পূর্ণ পাঠ করে থাকলে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জানতে ও শিখতে পারবে। তোমাদের সুবিধা মতোই পাঠ আলোচনাগুলি করা হয়। আবার দেখা হবে নতুন কোন পাঠ আলোচনায়।  সে পর্যন্ত সবাই ভালো ও সুস্থ থাকবে এই কামনাই করি।

আল্লাহ হাফেজ!

Related Articles

One Comment

  1. পোস্টটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কয়েকটি ওয়েবসাইট অনুসন্ধান করে আপনাদের ওয়েবসাইটে সঠিক ফলাফল পেয়েছি। আপনাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ। প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button