বিজ্ঞান সপ্তম শ্রেনী

পরিপাকতন্ত্র এবং রক্ত সংবহনতন্ত্র | বিজ্ঞান | সপ্তম শ্রেনী

প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? আশা করি তোমরা সকলেই অনেক ভালো ও সুস্থ আছো। তোমার জানো যে, সাধারণত  আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি তাদের অধিকাংশই বা কিছু জটিল খাদ্য বিদ্যমান । এই জটিল খাদ্যদ্রব্যকে আমাদের শরীর শোষণ করে সরাসরি কাজে লাগাতে পারে না। শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় জটিল, অদ্রবণীয় খাদ্যবস্তু নির্দিষ্ট এনজাইমের সহায়তায় দেহের গ্রহণ উপযোগী দ্রবণীয় সরল ও তরল খাদ্য উপাদানে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াকে পরিপাক বলে। যে তন্ত্র পরিপাকে অংশ নেয় তাকে পৌষ্টিকতন্ত্র বা পরিপাক তন্ত্র বলে।

পরিপাক তন্ত্র কাকে বলে?

প্রাণিদেহের যাবতীয় জৈবনিক কাজের ক্ষুদ্রতম একক হলো কোষ। বেঁচে থাকার জন্য প্রতিটি কোষের প্রয়োজন অক্সিজেন ও খাদ্য। বিপাকের ফলে কিছু অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর বস্তু তৈরি হয় যেগুলো অপসারণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে দেহের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও তন্ত্রের মধ্যে যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন। রক্ত সংবহনতন্ত্র এই যোগাযোগের কাজটি করে থাকে।

খাদ্য পরিপাক

বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য প্রয়োজন। আমরা কী কী খাদ্য খাই? খাদ্য কেন খাই? নিনোর প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আমরা তা জানার চেষ্টা করি।

ক. আমাদের দেহে খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা কী?

খ. প্রধান তিন শ্রেণির খাদ্যগুলো কী কী?

গ. কীভাবে তিন শ্রেণির খাদ্য আমাদের দেহের চাহিদা মেটায়?

ঘ. ভিটামিন ও খনিজ লবণের প্রয়োজনীয়তা কী?

ঙ. হজম হয় না এমন আঁশযুক্ত খাবারের প্রয়োজনীয়তা কী? কী ধরনের খাবারে এটা পাওয়া যায়? তোমরা এ প্রশ্নগুলোর উত্তর জেনেছ ষষ্ঠ শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ের ত্রয়োদশ অধ্যায়ে। এ অধ্যায়ে আমরা

দেহে খাদ্যের কী পরিবর্তন ঘটে তা জানব। আমরা মুখ দিয়ে খাবার খাই। খাদ্য গিলে ফেলার পর আমরা খাদ্যকে আর দেখতে পাই না। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই খাদ্য পরিপাক হয়ে সরল উপাদানে পরিণত হয়, যা দেহ শোষণ করে নেয়। হজম না হওয়া অপ্রয়োজনীয় বস্তুগুলো দেহ থেকে মলরূপে বের করে দেয়। দেহের ভিতর খাদ্যের যে পরিবর্তন ঘটছে, তার উপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সুস্থ দেহে এ কাজটি আপনা-আপনি ঘটে। মুখ দিয়ে খাদ্য গ্রহণ এবং খাদ্যের অপ্রয়োজনীয় অংশ উচ্ছিষ্ট হিসেবে পায়ুপথে বের করে দেওয়া এটুকুই আমরা দেখছি। এই দুটি ঘটনার মাঝখানে খাদ্যের কী পরিবর্তন ঘটছে?

যে সকল অঙ্গ খাদ্যের এই পরিবর্তন ঘটাতে অংশ নেয় তাদেরকে একত্রে পৌষ্টিকতন্ত্র বা পরিপাকতন্ত্র বলা হয়। আমরা যে খাবার খাই তার পরিপাক আরম্ভ হয় মুখগহ্বরে। মুখগহ্বরের ভিতর খাদ্যের কী পরিবর্তন ঘটে তা আমরা নিম্নের পরীক্ষণ দ্বারা নিজেরা করে দেখতে পারি ।

লালা ও এনজাইম

তুমি খুব মিষ্টি পছন্দ কর। তোমার সামনে এক থালা রসগোল্লা রাখা হলো। তোমার মুখের ভিতর কোনো পরিবর্তন লক্ষ করছ কি? তোমার মুখের ভিতর কোনো পানির মতো তরল পদার্থের উপস্থিতি অনুভব করছ কি? তোমার ডান হাতটি ভাল করে সাবান দিয়ে ধুয়ে নাও। পরিষ্কার আঙ্গুল দিয়ে জিহ্বা থেকে কিছুটা তরল পদার্থ নাও। এর বর্ণ কেমন?

উপরের পরীক্ষা থেকে যা জানলাম তা নিন্মের বর্ণনার সাথে মিলিয়ে নেই। আমরা মুখ দিয়ে খাবার খাই। খাবার মুখে নিয়ে আমরা তা পাত দিয়ে চিবুতে থাকি। জিহ্বা খাবারগুলোকে নেড়েচেড়ে দেয় যেন এগুলো ভাল করে চিবানো যায়। মুখের মধ্যে ঐ খাবারগুলো লালার সাথে মিশ্রিত হয়। লালা একপ্রকার বর্ণহীন তরল পদার্থ। মুখের পেছনে অবস্থিত লালাগ্রন্থি থেকে লালা নিঃসৃত হয়। খাদ্য পরিপাকে লালার বিশেষ ভূমিকা আছে। লালা খাদ্যকতুকে পিচ্ছিল করে ও গিলতে সাহায্য করে। লালায় এক ধরনের অনুঘটক বা

এনজাইম থাকে। তোমরা হয়তো ভাবছো এনজাইম কী? এনজাইম হলো :

• এমন একটি বস্তু, যা খাদ্যকতুর সাথে মিশে রাসায়নিক ক্রিয়ায় সাহায্য করে, কিন্তুনিজে অংশ নেয়না ও অপরিবর্তীত থাকে।

• নির্দিষ্ট তাপমাত্রা পর্যন্ত এনজাইম ভাল কাজ করে।

• নির্দিষ্ট এনজাইম নির্দিষ্ট কাজ করে। যেমন- ট্রিপসিন এনজাইম শুধুমাত্র আমিষের উপর ক্রিয়া করে।

লালার এনজাইম শ্বেতসারকে পরিবর্তন করে শর্করায় (মলটোজ) পরিণত করে। এ কারণে শর্করা জাতীয় খাবার চিবানোর পর কিছুক্ষণ মুখে রাখলে মিষ্টি লাগে। জিহ্বা আমাদের খাদ্যবস্তু গিলতে সাহায্য করে। মুখের শেষ প্রান্ত থেকে দুইটি নল আমাদের দেহের ভিতরের দিকে নেমে গেছে। এই নলের মতো অংশটিকে অন্ননালি বলে। এই নালি দিয়ে খাদ্য ও পানীয় পাকস্থলিতে পৌঁছায়।

 

পাঠ মূল্যায়ন

প্রশ্ন-১। কোন খাদ্য সহজে হজম হয় না?

উত্তর : আঁশযুক্ত খাবার।

প্রশ্ন-২। খাদ্য পরিপাক হওয়ার পর কীসে পরিনত হয়?

উত্তর :  সরল উপাধানে।

প্রশ্ন-৩। লালা গ্রন্থি মুখের কোথায় অবস্থিত?

উত্তর : পেছনে।

প্রশ্ন-৪। খাদ্য গ্রহনে জিহ্বার ভূমিকা কি?

উত্তর: খাদ্য নেড়েচেড়ে দেয়।

প্রশ্ন-৫। লালার এনজাইমের নাম কি?

উত্তর: টায়ালিন।

 

পরিপাকতন্ত্র

আমরা আগেই জেনেছি জীবন ধারণের জন্য চাই খাদ্য। আমরা জটিল খাদ্য খেয়ে থাকি। আমরা এও জেনেছি, জটিল খাদ্য দেহকোষ সরাসরি গ্রহণ করতে পারে না। সেজন্য জটিল খাদ্যকে রাসায়নিক প্রক্রিয়াতে সরল ও পানিতে দ্রবীভূত করা প্রয়োজন। এ কাজকে খাদ্যের হজমক্রিয়া বা পরিপাক বলে। হজম কাজ সম্পন্ন করার জন্য বিভিন্ন অঙ্গ নিয়ে গঠিত হয় পৌষ্টিকনালি বা পরিপাকনালি এর সাথে রয়েছে কতগুলো জারক রস ও সাহায্যকারী এনজাইম নিঃসরণকারী গ্রন্থি।

মুখছিদ্র, মুখগহ্বর, অন্ননালি, পাকস্থলি, ক্ষুদ্রাস্ত্র এবং বৃহদন্ত্র নিয়ে পৌষ্টিকনালি গঠিত। এছাড়া পৌষ্টিকনালির সাথে রয়েছে বিভিন্ন এনজাইম বা জারক রস নিঃসরণকারী তিনটি গ্রন্থি যথা: লালাগ্রন্থি, অগ্নাশয় এবং যকৃৎ। এছাড়া পাকস্থলি ও ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রাচীরেও আছে আরও এনজাইম ও জারক রস নিঃসরণকারী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রন্থি । আমাদের পরিপাকনালি বা পৌষ্টিকনালি মুখগহ্বর থেকে শুরু করে মলদ্বার পর্যন্ত বিস্তৃত।

আর এ তন্ত্রগুলোর মোট ৮টি অংঙ্গ বিদ্যমান।  যথা-

১। মুখ ছিদ্র

২। মুখগহ্বর

৩। গলবিল

৪। অন্ননালি

৫। পাকস্থলী

৬। ক্ষুদ্রান্তু

৭। বৃহদন্ত্র

৮। মলদ্বার

পরিপাকগ্রন্থি ও পরিপাকগ্রন্থির কাজ : পরিপাকনালির যেসব গ্রন্থির নিঃসত রস খাদ্য পরিপাকে অংশগ্রহণ করে তাদের পরিপাকগ্রন্থি বলে।

তোমরা আগেই জেনেছ লালাগ্রন্থি, যকৃৎ এবং অগ্ন্যাশয় পরিপাক গ্রন্থির অন্তর্ভুক্ত। লালাগ্রন্থি থেকে লালা ক্ষরণ হয়। লালায় এনজাইম ও পানি থাকে। পানি খাদ্যকে নরম করে। লালার এনজাইম হলো টায়ালিন।

যকৃৎ : দেহের সবচেয়ে বড় গ্রন্থি হলো যকৃৎ। যকৃৎ থেকে পিত্তরস তৈরি হয়। পিত্তরস পিত্তথলিতে জমা থাকে। হজমের সময় পিত্তনালি দিয়ে পিত্তরস ডিওডেনামে এসে খাদ্যের সঙ্গে মিশে। পিত্তরস স্নেহ জাতীয় খাদ্য হজমে সাহায্য করে।

অগ্ন্যাশয় : প্রধানত তিনটি এনজাইম অগ্ন্যাশয়ে তৈরি হয়। যথা-অ্যামাইলেজ, ট্রিপসিন, কাইমোট্রিপসিন

এবং লাইপেজ ডিওডেনামে এসে খাদ্যের সঙ্গে মেশে। ট্রিপসিন ও কাইমোট্রিপসিন আমিষ খাদ্য, লাইপেজ স্নেহ খাদ্য এবং অ্যামাইলেজ শর্করা জাতীয় খাদ্য হজমে সাহায্য করে। গ্যাস্ট্রিক গ্রন্থি: গ্যাস্ট্রিকগ্রন্থি পাকস্থলির ভিতরের প্রাচীরে থাকে। এই গ্রন্থি নিঃসৃত রসের নাম গ্যাস্ট্রিক রস বা পাচক রস।

আন্ত্রিক গ্রন্থি: ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রাচীরে ভিলাসে প্রচুর আন্ত্রিক গ্রন্থি থাকে। এই গ্রন্থি নিঃসৃত রসের নাম আন্ত্রিক রস।

বৃহদন্ত্র : বৃহদন্ত্রে খাদ্য হজম হয় না। এখানে কোনো জারক রস বা এনজাইম তৈরি হয় না। বৃহদন্ত্র মূলত খাদ্যের জলীয় অংশ থেকে পানি শোষণ করে। এ কাজটি অত্যন্ত দরকারি। এতে শরীর থেকে পানি বেশি পরিমাণে বের হওয়া রোধ করে। বৃহদন্ত্রের সর্বশেষ অংশ অর্থাৎ মলাশয়ে খাদ্যের অপাচ্য অংশ মল হিসাবে সঞ্চিত হয়। প্রয়োজনমতো পরে পায়ু দিয়ে তা শরীরের বাইরে বর্জিত হয়।

 

পাঠ মূল্যায়ন

প্রশ্ন-১। ব্যাসিলারি আমাশয়ে ব্যাকটেরিয়াটির নাম কি?

উত্তর : সিগেলা।

প্রশ্ন-২। কাঁচা ফলমূল ও শাকসবজি না খেলে কোন রোগ হওয়ার আশংকা থাকে?

উত্তর : কোষ্ঠকাঠিন্য।

প্রশ্ন-৩। কোন রোগট অবহেলা করা ঠিক নয়?

উত্তর :  ব্যাসিলারি আমাশয়।

প্রশ্ন-৪। পানি কখন খাওয়া উচিত?

উত্তর: খাদ্য খাওয়ার কিছুক্ষণ পরে।

প্রশ্ন-৫। গ্যাস্টাইটিস এর পরিনতি কি?

উত্তর: গ্যাস্টিক আলসার।

 

 

সাধারণ রোগ ও প্রতিকা

গ্যাস্ট্রাইটিস : সাধারণত বেশি মসলা ও তেলযুক্ত খাবার খেলে, খাওয়ায় অনিয়ম করলে বুক জ্বালা আর অম্বল হয়। এতে পেটে বাড়তি এসিড তৈরি হয় আর তা থেকে পেট বা বুকের মাঝখানে একটা অস্বস্তি বা জ্বালার ভাব হয়। গলা ও পেট জ্বালা করে এবং পেটে ব্যথাসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। সময়মত এ রোগের চিকিৎসা করা না হলে পাকস্থলি ও অস্ত্রে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। তখন একে গ্যাস্ট্রিক আলসার বলে। নিয়মিতভাবে কম মসলা ও তেলযুক্ত খাবার খাওয়া এবং সময়মত খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস করলে এ রোগ প্রতিরোধ করা যায়।

২. আমাশয় : আমাশয় আমাদের দেশে একটি অতি পরিচিত রোগ। দুই ধরনের আমাশয় দেখা যায়।

(ক) অ্যামিবিক আমাশয় : প্রধাণত এন্টামিবা নামে এক প্রকার এককোষী প্রাণী মানুষের অস্ত্রে প্রবেশ করলে এ ধরনের রোগ দেখা দেয়। এ রোগের উপসর্গগুলো হলো- তলপেটে ব্যথা, মলের সাথে রক্ত বা শ্লেষ্মা বের হওয়া।

নলকূপের পানি বা ফুটানো পানি পান, পানি ও শাকসবজি যাতে দূষিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা। মাছি, আরশোলা থেকে খাদ্যবস্তুকে রক্ষার মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর (খ) চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা প্রয়োজন ।

ব্যাসিলারি আমাশয় : সিগেলা নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া অস্ত্রকে আক্রমণ করলে এ ধরনের আমাশয় হয়। জীবাণু বৃহদন্ত্রের ঝিল্লিকে আক্রমণ করে। ফলে বারবার পায়খানা হয় এবং পায়খানার সাথে শ্লেষ্মা বের হয়। অনেক সময় এর সাথে রক্তও যায়। এজন্য এ রোগকে রক্ত আমাশয় বলে। এ রোগকে

অবহেলা করা ঠিক নয়। ডাক্তারের পরামর্শে চিকিৎসা করা প্রয়োজন। সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এ

রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

কোষ্ঠকাঠিন্য : কোষ্ঠকাঠিন্য প্রকৃতপক্ষে কোনো রোগ নয়। বিভিন্ন কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। যেমন- পৌষ্টিকনালির মধ্য দিয়ে খাদ্যবস্তুর চলন ধীর হওয়া, কাঁচা ফলমূল ও শাকসবজি না খাওয়া, পায়খানার বেগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে পায়খানায় না বসা ইত্যাদি।  নিয়মিত মল ত্যাগের অভ্যাস গড়ে তোলা,নিয়মিত শাকসবজি খাওয়া,  ফলমূল আঁশযুক্ত যুক্ত খাবার খাওয়ার মাধ্যমে এ অসুবিধা দূর করা যায়।

পরিপাকতন্ত্রের যত্ন

১। দাঁত: প্রতিবার খাওয়ার পর দাঁত ব্রাশ করা ও পরিষ্কার করা উচিত। দাঁতের ফাঁকে খাবারের কণা আটকে থাকলে তা পচে মুখে দুর্গন্ধ হয়। দাঁতের ক্ষয় হয়। খুব বেশি মিষ্টি খেতে নেই। মিষ্টি দাঁত ক্ষয়ের জন্য দায়ী।

২। খাদ্যবস্তু: খাদ্যবস্তু পরিষ্কার ও সুসিদ্ধ হওয়া উচিত। বাসি পচা খাবার খাওয়া উচিত নয়।

আঙ্গুলের নখ ছোট রাখা এবং খাওয়ার আগে থালাবাটি ও হাত অবশ্যই পরিষ্কার করে নিতে হবে।

৩। খাওয়া: নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া উচিত। একসাথে বেশি খাবার খাবে না। সব সময় সুষম খাবার খাবে। খাওয়ার কিছুক্ষণ পর প্রচুর পানি খাবে। সব সময় পানি ফুটিয়ে ঠান্ডা করে খাবে। খাবার ধীরে ধীরে ভালো করে চিবিয়ে খাবে। অধিক মসলা ও তেলযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত নয়।

রক্ত সংবহন তন্ত্র

যে প্রক্রিয়ায় প্রাণিদেহে রক্ত পরিবহনের কাজ সম্পন্ন হয় তাকে সংবহন প্রক্রিয়া বলে। রক্ত, হূৎপিন্ড, ধমনি, শিরা এবং লসিকা ও লসিকাবাহী নালির সমন্বয়ে মানব দেহের সংবহনতন্ত্র গঠিত। যে তন্ত্রের মাধ্যমে দেহে রক্ত সঞ্চালিত হয় তাকে রক্ত সংবহনতন্ত্র বলে। হূৎপিন্ড, রক্ত ও রক্তবাহী নালির সমন্বয়ে রক্ত সংবহনতন্ত্র গঠিত।

রক্ত ও রক্তের উপাদান

তোমরা মুরগি, গরু অথবা ছাগল জবাই করতে দেখে থাকবে। জবাই করার সময় ক্ষতস্থান থেকে ফিকি দিয়ে রক্ত বের হয়। এই রক্তের রঙ কেমন? রক্ত কী ধরনের পদার্থ? রক্ত ঘন লাল রঙের একটি তরল পদার্থ। এটি এক ধরনের তরল যোজক কলা বা টিস্যু। রক্তের স্বাদ ক্ষারধর্মী। রক্তের উপাদান দুইটি, যথা-

১। রক্তরস

২। রক্তকণিক

রক্তনালি

তোমর হাতের উপর লক্ষ্য করল দেখতে পারবে নীল রঙেরএক ধরনের নালি দেখা যায়।  এগুলো হল শিরা।  শিরা একধরনের রক্তনালি। রক্তনালি কি? যে নালির মধ্য দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয় তাকে রক্তনালি বলে৷  আমাদের দেহে তিন ধরনের রক্তনালি আছে। যথা-

১। ধমনি

২। শিরা

৩। কৈশিকনালি

 

পাঠ মূল্যায়ন

প্রশ্ন-১। রক্তের উপাদান কয়টি?

উত্তর : ২টি।

প্রশ্ন-২। রক্তের কতভাগ রক্তরস?

উত্তর : ৫৫%।

প্রশ্ন-৩। রক্ত লাল দেখায় কোনটির জন্য? 

উত্তর : রক্তকণিক।

প্রশ্ন-৪। অনুচক্রিকার কাজ কি?

উত্তর: রক্তপাত ঘটলে জমাট বাঁধানো।

প্রশ্ন-৫। রক্ত কোনটি পরিবহন করে না?

উত্তর: পানি৷


হূৎপিণ্ড

হূৎপিণ্ড বক্ষগহ্বরের বাম দিকে দুই ফুসফুসের মাঝখানে অবস্থিত একটি মোচাকৃতির অঙ্গ। এটা পেরিকার্ডিয়াম নামে দুই স্তরবিশিষ্ট একটি পাতলা পর্দা দ্বারা আবৃত। হৃৎপিণ্ড হূৎপেশি দ্বারা গঠিত। হৃৎপেশি এক ধরনের স্বাধীন অনৈচ্ছিক পেশি, যা কারো নিয়ন্ত্রণ ছাড়া নিজে নিজেই সংকোচন ও প্রসারণে সক্ষম। প্রতি মিনিটে কমবেশি ৭২ বার হূৎপিন্ড সংকোচিত ও প্রসারিত হয়। তুমি তোমার বুকের মাঝখানে হাত রাখ। একটা ধুকধুকানি বা কোনো স্পন্দন টের পাচ্ছ কী? কেন এমন ঘটে? হূৎপিণ্ডের সংকোচন ও প্রসারণের ফলে এইরূপ ঘটে। এটা হৃদস্পন্দন।

হূৎপিণ্ড তিন স্তরে গঠিত। যথা-

ক. বাইরের স্তর বা এপিকার্ডিয়াম

খ. মাঝের স্তর বা মায়োকার্ডিয়াম

গ. ভিতরের স্তর বা এন্ডোকার্ডিয়াম।

এদের মধ্যে মায়োকার্ডিয়ামই সবচেয়ে পুরু এবং এর সংকোচনের কারণে হূৎপিণ্ড পাম্প করে রক্ত সঞ্চালন করে। হূৎপিণ্ড একটি চার প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট ফাঁপা অঙ্গ। হৃৎপিণ্ডের উপরের প্রকোষ্ঠ দুটির নাম ডান অলিন্দ ও বাম অলিন্দ এবং নিচের প্রকোষ্ঠ দুইটি যথাক্রমে ডান ও বাম নিলয় । অলিন্দে প্রাচীর পাতলা ও নিলয়ের প্রাচীর পুরু থাকে। অলিন্দ ও নিলয় দুইটি আলাদা প্রাচীর দ্বারা পৃথক থাকে। আয়তনে অলিন্দগুলো নিলয়ের চেয়ে আকারে ছোট হয়। ডান অলিন্দ ও ডান নিলয়ের মাঝে ডান অলিন্দ-নিলয় ছিদ্র থাকে। ঐ ছিদ্রপথে কপাটিকা থাকে। রক্ত এ ছিদ্রপথে অলিন্দ থেকে নিলয়ে প্রবেশ করতে পারে। অনুরূপভাবে বাম অলিন্দ ও নিলয়ের মাঝে কপাটিকা থাকে। এক্ষেত্রেও বাম অলিন্দ থেকে রক্ত কেবল মাত্র নিলয়ে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া মহাধমনি ও বাম নিলয়ের সংযোগস্থলে ও ফুসফুসীয় ধমনি এবং ডান নিলয়ের সংযোগস্থলে অর্ধচন্দ্রাকৃতির কপাটিকা রয়েছে। এ কপাটিকাগুলো রক্তের গতিপথ একদিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

হূৎপিণ্ডর মাধ্যমে রক্ত সঞ্চালন :

হৃৎপিণ্ড হৃৎপেশি নামক এক বিশেষ ধরনের অনৈচ্ছিক পেশি দ্বারা গঠিত। যখন হৃৎপিণ্ডর সংকোচন হয় তখন হৃৎপিণ্ড থেকে রক্ত ধমনি পথে বিভিন্ন অংশে সঞ্চালিত হয়। আবার হৃৎপিণ্ডে যখন প্রসারণ ঘটে তখন দেহের বিভিন্ন অঙ্গ থেকে রক্ত শিরা পথে হৃৎপিণ্ডে ফিরে আসে। এভাবে হূৎপিণ্ডর সংকোচন প্রসারণ দ্বারা রক্ত একবার হূৎপিণ্ডে প্রবেশ করে আবার হৃৎপিণ্ড থেকে দেহের বিভিন্ন অঙ্গে সঞ্চালিত হয়।

হৃদরোগ

আমান সাহেব একজন ব্যাংক কর্মচারী। তিনি একজন মাঝারি গড়নের মোটাসোটা মানুষ। তিনি মাছ- মাংস ও তেলযুক্ত খাবার খেতে খুব পছন্দ করেন। তিনি একজন ধূমপায়ী। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটানা পরিশ্রম করেন। পরিশ্রমের সাথে মাত্রাতিরিক্ত ধূমপান করেন। সারা দিন হাঁটাচলা, ব্যায়াম হয় । বললেই চলে। হঠাৎ একদিন অফিস থেকে ফিরে বুকের বাম দিকে ব্যথা অনুভব করলেন। কিছুক্ষণের -ধ্যই ব্যথা তীব্র হলো। তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। তার স্ত্রী তৎক্ষণাৎ তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।

ডাক্তার তাঁকে পরীক্ষা করে বললেন যে, আমান সাহেব হৃদরোগে ভুগছেন। এবার বলতে হৃদরোগের কারণগুলো কী কী ?

হৃদরোগের কারণ :

উপরের অনুচ্ছেদ থেকে আমরা হৃদরোগের যে কারণগুলো জানতে পারলাম তা হলো:

• অধিক তেল ও চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ।

• সুষম খাদ্য গ্রহণ না করা।

• ধূমপান করা।

• অতিরিক্ত পরিশ্রম করা।

• খেলাধুলা, চলাচল, কসরত বা কোনো রকম শারীরিক পরিশ্রম না করা ।

হৃদরোগের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়-

১। অধিক শর্করা যুক্ত খাদ্য  না খাওয়াই উত্তম ।

২। প্রতিদিন  শারীরিক  পরিশ্রম করা মানে সারাদিন বসে না থেকে কাজে জড়িত থাকা । যথা- খেলাধুলা, হাঁটাচলা, ব্যায়াম করার নিয়মিত করা গড়ে তোলা।

৩। নিয়মিত সুষম খাদ্য গ্রহণ করা।

৪। ধূমপান ত্যাগ করা। ধূমপানের ফলে ধমনিগাত্র শক্ত হয়ে রক্ত প্রবাহের ব্যাঘাত ঘটায়।

৫। অতিরিক্ত পরিশ্রম, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তামুক্ত থাকার চেষ্টা করা।

৬। তাজা ফলমূল, শাকসবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা ।

৭। দেহের ওজন বাড়তে না দেওয়া। দেহের ওজন বেড়ে গেলে হূৎপিণ্ডের উপর রক্ত সঞ্চালনের চাপ পড়ে। ফলে হূৎপিণ্ড ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

 

পাঠ মূল্যায়ন

প্রশ্ন-১। হূৎপিণ্ডে অলিন্দ থাকে কয়টি?

উত্তর : ২টি।

প্রশ্ন-২। ধমবীর গহবর কেমন?

উত্তর : ছোট।

প্রশ্ন-৩। মানবদেহে হূৎপিণ্ড কয়টি থাকে?

উত্তর : ১টি।

প্রশ্ন-৪। হূৎপিণ্ডের বাইরের স্তরকে কি বলে?

উত্তর: পেরিকার্ডিয়াম।

প্রশ্ন-৫। ওপরের দুটি প্রকোষ্ঠে কী থাকে? 

উত্তর: দুটি অলিন্দ।


সৃজনশীল প্রশ্ন

নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও : আরমান সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। মাদরাসা থেকে এসে একদিন সে পেটে জ্বালা ও ব্যথা অনুভব করলে তার মা তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় ।
ক.  এন্টামিবা কী ?

উত্তর : এক প্রকার এককোষী প্রাণী।
খ. ব্যাসিলারি আমাশয় কেন হয়? ব্যাখ্যা কর ।

উত্তর: ব্যাসিলারি আমাশয় সিগেলা নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। এই ব্যাকটেরিয়া অস্ত্রকে আক্রমণ করলে ব্যাসিলারি আমাশয় হয়ে থাকে ।
গ. আরমানের রোগটি সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখ ।
উত্তর : আরমান গ্যাস্ট্রাইটিস নামক রোগে আক্রান্ত। আরমানের রোগ সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো- সাধারণত বেশি মসলা ও তেলযুক্ত খাবার খেলে, খাওয়ায় অনিয়ম করলে বুক জ্বালা আর অম্বল হয় । এতে পেটে
বাড়তি এসিড তৈরি হয়, আর তা থেকে পেট বা বুকের মাঝখানে একটা অস্বস্তি বা জ্বালার ভাব হয় । গলা, পেট জ্বালা করে ও পেটে ব্যথাসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয় । সময়মতো এ রোগের চিকিৎসা করা না হলে পাকস্থলি ও অস্ত্রে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। তখন একে গ্যাস্ট্রিক আলসার বলে । নিয়মিতভাবে কম মসলা, তেলযুক্ত খাবার না খাওয়া এবং সময়মতো খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস করলে এ রোগ প্রতিরোধ করা যায় ।
ঘ. আরমান তার পরিপাকতন্ত্রের যত্ন কিভাবে নিতে পারে?
 উত্তর : আরমান তার পরিপাকতন্ত্রের যত্ন নিম্নরূপে নিতে পারে :

১. দাঁত : প্রতিবার খাওয়ার পর দাঁত ব্রাশ করা ও পরিষ্কার করা উচিত । দাঁতের ফাঁকে খাবারের কণা আটকে থাকলে তা পচে মুখে দুর্গন্ধ হয়। দাঁতের ক্ষয় হয়। খুব বেশি মিষ্টি খেতে নেই । মিষ্টি দাঁত ক্ষয়ের জন্য দায়ী ।

২. খাদ্যবস্তু : খাদ্যবস্তু পরিষ্কার ও সুসিদ্ধ হওয়া উচিত। বাসি পচা খাবার খাওয়া উচিত নয়। আঙ্গুলের নখ ছোট রাখা ও খাওয়ার আগে থালাবাটি ও হাত অবশ্যই পরিষ্কার করে ধুয়ে নিতে হবে ।

৩. খাওয়া : নির্ধারিত সময়ে খাবার খাওয়া উচিত । একসাথে বেশি খাবার খাবে না। সব সময় সুষম খাবার খাবে। খাওয়ার কিছুক্ষণ পর প্রচুর পানি খাবে । সব সময় পানি ফুটিয়ে ঠাণ্ডা করে খাবে। খাবার ধীরে ধীরে ভালো করে চিবিয়ে খাবে। অধিক মসলা ও তেলযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত নয় ।

তো শিক্ষার্থী বন্ধুরা,  আমাদের আজকের এই পাঠ আলোচনা এই পর্যন্ত।  আশা করি এর থেকে অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পারবে এবং পরীক্ষার  ভালো প্রস্তুতি গ্রহন করতে পারবে। আবার দেখা হবে নতুন কোন পাঠ আলোচনায়।  সে পর্যন্ত সবাই ভালো ও সুস্থ থাকবে এই কামনাই করি।

আল্লাহ হাফেজ!

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button