বিজ্ঞান সপ্তম শ্রেনী

নিম্ন শ্রেণীর জীব | বিজ্ঞান | দাখিল সপ্তম শ্রেণী

তোমরা অবশ্যই জানো  ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, শৈবাল, অ্যামিবা ইত্যাদিকে নিম্নশ্রেণির জীব বলা হয়। এদের মধ্যে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও অ্যামিবা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্য ছাড়া দেখা যায় না। এরা অণুজীবের অন্তর্ভুক্ত। কিছু কিছু ছত্রাক ও শৈবাল  যা খালি চোখে লক্ষ  গেলেও অধিকাংশ ছত্রাক ও শৈবাল দেখতে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্য প্রয়োজন হয়। আজকে আমরা আলোচনা করবো এই নানান প্রজাতির ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, শৈবাল, অ্যামিবা এগুলো নিয়েই। তোমার অবশ্যই মনযোগ সহকারে সম্পূর্ণ আলোচনা গুলি পড়বে এবং গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নগুলোকে চিন্হিত করা হয়েছে সেগুলোকে আয়ত্তে আনার চেষ্টা করবে।  এতে করে তোমাদের পরীক্ষায় উত্তর করতে সুবিধা পাবে৷ 

 

অণুজীব জগৎ 

আমরা আমাদের দিকে অসংখ্য  জীব দেখি। এই জীবগুলি ব্যতীত ও  আমাদের পরিবেশে আরো নানান ধরনের  জীব বিদ্যমান যাদের খালি চোখে দেখতে আমরা সক্ষম  নই। যাদের নির্দিষ্ট কেন্দ্রিকাযুক্ত এবং  সুগঠিত কোষ নেই। এরাই অণুজীব নামে পরিচিত। এসব অণুজীব থেকেই সৃষ্টির শুরুতে জীবনের সূত্রপাত হয়েছে। তাই অণুজীদেরকে আদিজীবও বলা হয়ে থাকে।তোমরা ষষ্ঠ শ্রেণিতে মারগুলিস ও হুইটেকারের জীবজগতের পঞ্চরাজ্য প্রস্তাবনায় অনুজীবসমূহকে মনেরা, প্রোটিস্টা ও ফানজাই রাজ্যে দেখতে পেয়েছো। আবার অণুজীবসমূহের শ্রেণিবিভাগ করতে গিয়ে বর্তমান কালে অণুজীব বিজ্ঞানীগণ এ জগৎকে তিনটি রাজ্যে ভাগ করেছেন।

১) এক্যারিওটা রাজ্য – এক্যারিওটা বা অকোষীয় : এসব অণুজীব এতই ছোট যে তা সাধারণ আলোক অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচেও দেখা যায় না। এদের দেখতে ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন হয়, যেমন- ভাইরাস।

২) প্রোক্যারিওটা – প্রোক্যারিওটা বা আদিকোষী : যেসব অণুজীবের কোষের কেন্দ্রিকা সুগঠিত নয় তারাই এ রাজ্যের সদস্য। সুগঠিত কেন্দ্রিকা না থাকায় এদের কোষকে আদিকোষ বলা হয়, যথা- ব্যাকটেরিয়া।

৩) ইউক্যারিওটা – ইউক্যারিওটা বা প্রকৃতকোষী : যেসব অণুজীব কোষের কেন্দ্রিকা সুগঠিত তাদেরই প্রকৃত কোষ বলে। শৈবাল, ছত্রাক ও প্রোটোজোয়া এ ধরনের অণুজীব।

ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া

ভাইরাস, রিকেটস, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, শৈবাল, প্রোটোজোয়া ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের অণুজীব আমাদের পরিবেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এরা অধিকাংশই আমাদের উপকার করে। তবে কিছু কিছু অণুজীব আছে যারা আমাদের দেহে রোগ সৃষ্টি করে। এবার আমরা কয়েকটি অণুজীব সম্পর্কে জানব।

ভাইরাস : ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া ভাইরাসদেরকে দেখা যায় না। এরা সরলতম জীব। ভাইরাসের দেহে কোষপ্রাচীর, প্লাজমালেমা, সুসংগঠিত নিউক্লিয়াস, সাইটোপ্লাজম ইত্যাদি কিছুই নেই। তাই ভাইরাস দেহকে অকোষীয়ও বলা হয় । এরা শুধুমাত্র আমিষ আবরণ ও নিউক্লিক এসিড (ডিএনএ বা আরএনএ) নিয়ে গঠিত। এদের আমিষ আবরণ থেকে নিউক্লিক এসিড বের হয়ে গেলে এরা জীবনের সকল লক্ষণ হারিয়ে ফেলে ।

তবে অন্য জীবদেহে যেইমাত্র আমিষ আবরণ ও নিউক্লিক এসিডকে একর করা হয়, তখনি এরা জীবনের সব লক্ষণ ফিরে পায়। অর্থাৎ জীবিত জীবদেহ ছাড়া বা জীবদেহের বাইরে এরা জীবনের কোন লক্ষণ দেখায় না। এ কারণে ভাইরাস প্রকৃত পরজীবি ।ভাইরাসদের মধ্যে ব্যাকটেরিওফাজ ভাইরাস একটি পরিচিত ভাইরাস। চিত্রে এদের গঠন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হলো । ভাইরাস গোলাকার, দন্ডাকার, ব্যাঙাচির ন্যায় ও পাউরুটির ন্যায় হতে পারে। ভাইরাস মানবদেহে বসন্ত, হাম, সর্দি, ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি রোগ সৃষ্টি করে। ধানের টুংরো ও তামাকের মোজায়েক রোগ ভাইরাসের কারণে হয়। বসন্ত, হাম, সর্দি ইত্যাদি বায়ুবাহিত রোগ।

ব্যাকটেরিয়া : ব্যাকটেরিয়ার কিছু কথা আমরা পূর্বের শ্রেণিতে জেনেছি। এবার একটু বিস্তারিত জানবো। ব্যাকটেরিয়া হলো আদি নিউক্লিয়াসযুক্ত, অসবুজ, এককোষী অণুবীক্ষণিক জীব। বিজ্ঞানী অ্যান্টনি ফন লিউয়েন হুক সর্ব প্রথম ব্যাকটেরিয়া দেখতে পান। ব্যাকটেরিয়া কোষ গোলাকার, দণ্ডাকার, কমা আকার, প্যাচানো ইত্যাদি নানা ধরণের হতে পারে। দেহের আকার আকৃতির ভিত্তিতে একে নিম্নরূপে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।

কক্কাস : কোনো কোনো ব্যাকটেরিয়া কোষের আকৃতি গোলাকার। এরা কক্কাস ব্যাকটেরিয়া। এরা এককভাবে অথবা দলবেঁধে থাকতে পারে, যেমন- নিউমোনিয়া রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া।

ব্যাসিলাস : এরা দেখতে লম্বা দণ্ডের ন্যায় । ধনুষ্টংকার, রক্তামাশয়ইত্যাদি রোগ এরা সৃষ্টি করে।

কমা : এরা বাঁকা দণ্ডের ন্যায় আকৃতির ব্যাকটেরিয়া। মানুষের কলেরা রোগের ব্যাকটেরিয়া এ ধরনের।

স্পাইরিলাম : এই  ব্যাকটোরিয়াগুলি দেখতে আঁকাবাকা কিংবা প্যাচানো।

ব্যাকটেরিয়ার উপকারিতা 

• যেকোন জীবের মৃত দেহ ও ময়লা-আবর্জনা পচাতে ভূমিকা পালন  করে ।

•শুধুমাত্র এই ব্যাকটেরিয়াগুলোই প্রকৃতি থেকে মাটিতে নাইট্রোজেন সংরক্ষণ করে থাকে।

• এমনকি দই তৈরি করতেও কিন্তু ব্যাকটেরিয়ারই সাহায্য নিতে হয়।

• ব্যাকটেরিয়া জীন প্রকৌশলের মূল ভিত্তি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জীবের কাঙ্খিত বৈশিষ্ট্য পাওয়ার জন্য জীনগত পরিবর্তনের কাজে ব্যাকটেরিয়াকে ব্যবহার করা হয়।

ছত্রাক, শৈবাল ও আ্যামিবা

ছত্রাক : ছত্রাক সমাঙ্গদেহী ক্লোরোফিলবিহীন অসবুজ উদ্ভিদ। ক্লোরোফিলের অভাবে এরা সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে না। তাই এরা পরভোজী অথবা মৃতভোজী। পরভোজী ছত্রাক বাসি ও পচা খাদ্য দ্রব্য, ফলমূল, শাকসবজি, ভেজা রুটি বা চামড়া, গোবর ইত্যাদিতে জন্মায়। মৃতভোজী ছত্রাক মৃত জীবদেহে বা জৈব পদার্থেপূর্ণ মাটিতে জন্মায় ।

ছত্রাকের অর্থনৈতিক গুরুত্ব : পেনিসিলিনসহ বহু মূল্যবান ঔষধ ছত্রাক থেকে পাই। পাউরুটি তৈরিতে ঈস্ট নামক ছত্রাক ব্যবহার করা হয়। ঈস্ট ভিটামিন সমৃদ্ধ বলে ট্যাবলেট হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। এগারিকাস নামক এক ধরনের মাশরুম সৌখিন খাদ্য বলে বিবেচিত। বর্তমানে আমাদের দেশসহ বহু দেশে এর চাষ করা হয়। আবর্জনা পচিয়ে মাটিতে মেশাতেও ছত্রাকের এদের ভূমিকা রয়েছে। মানুষ, জীবজন্তু ও উদ্ভিদের বহু রোগের জন্য দায়ী এই ছত্রাক। দাদ, হুলী (ছোলম) ও মানুষের শ্বাসনালির প্রদাহ ছত্রাকের সংক্রমণে হয়ে থাকে। ছত্রাক আলুর বিলম্বিত ধ্বসা রোগ, পাটের কালোপট্টি রোগ, আখের লাল পড়া রোগ সৃষ্টি করে। 

ছত্রাক সংক্রমন প্রতিরোধকরণ: ছত্রাকজনিত রোগ খুবই ছোঁয়াচে । অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে এ রোগ সংক্রমিত হতে পারে। এসব রোগ থেকে নিরাপদ থাকতে যা করা দরকার তা হলো:

• ছত্রাকজনিত রোগে যারা  আক্রান্ত হয় সেসন  ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিসপত্র (পোশাক , ক্যাপ,জুতা) এগুলো ব্যবহার  করা থেকে বিরত থাকা ।

• ছত্রাকজনিত রোগে কেউ  আক্রান্ত হলে বা এ রোগের লক্ষন দেখা দিলেনরোগী  ব্যক্তির আশে-পাশে  কম আসা।

• ছত্রাকে আক্রান্ত উদ্ভিদে উপযুক্ত  ঔষধ প্রদান করা  বা আক্রান্ত  উদ্ভিদগুলি পুড়িয়ে ফেলা ।

শৈবাল : সমাঙ্গবর্গের ক্লোরোফিলযুক্ত ও স্ব-তোষী উদ্ভিদরাই শৈবাল। এরা মাটি, পানি ও অন্য গাছের উপর জন্মায়। সবুজ ছাড়াও লাল, বাদামি ইত্যাদি রঙের শৈবাল দেখা যায়। স্পাইরোগাইরা নামক শৈবাল বেশিরভাগ জলাশয়ে পাওয়া যায়।

শৈবাল উপকারিতা : আইসক্রিম তৈরিতে সামুদ্রিক শৈবালনাত অ্যাগজিন ব্যবহৃত হয়। সামুদ্রিক শৈবাল আয়োডিন ও পটাশিয়ামের একটি ভালো উৎস। মৎস্য চাষে শৈবাল খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় । শৈবাল অপকারিতা। মানুষ ও উদ্ভিদের নানা রোগ সৃষ্টিতে শৈবাল দায়ী। যেমন এক ধরনের শৈবাল চা- পাতার রেড রাস্ট রোগ সৃষ্টি করে। জলাশয়ে শৈবালের আধিক্য দেখা দিলে জলজ প্রাণী ও মাধ অক্সিজেনের অভাবে মারা যেতে পারে।

অ্যামিবা : প্রোটিস্টা রাজ্যের সদস্য অ্যামিবা এককোষী প্রাণী। এদের দেহ ক্ষুদ্রাকার। অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া এদের দেখা যায় না। এরা প্রয়োজনে দেহের আকার পরিবর্তন করে থাকে। এদের দেহ থেকে জাঙুলের মতো তৈরি অভিক্ষেপকে ক্ষণপদ বলে। এর সাহায্যে অ্যামিবা খাদ্যগ্রহণ ও চলাচল করে। এদের দেহে পানি গহ্বর, খাদ্যগহ্বর ও সংকোচন গহ্বর থাকে। এদের সারা দেহ একটি পাতলা ও স্বচ্ছ পর্দা দ্বারা ঘেরা থাকে। একে প্লাজমালেমা বলা হয়। অ্যামিবা পানিতে, স্যাঁতস্যাঁতে মাটিতে, পুকুরের তলার পচা জৈব আবর্জনার মধ্যে জন্মে।

এন্টামিবা: আমাশয় রোগ সাধারণত দুই ধরনের, যথা- এমিবিক ও ব্যাসিলারি। ব্যাসিলারি আমাশয়ের কারণ এক ধরনের ব্যাসিলাস ব্যাক্টেরিয়া । এন্টামিবা নামক এক ধরনের এককোষী প্রাণীর আক্রমণে এমিবিক আমাশয় হয়ে থাকে।

এন্টামিবা প্রোটিস্টা রাজ্যভুক্ত আরেক ধরনের এককোষী জীব। খালি চোখে এদের দেখা যায় না। এদের দেহের কোন নির্দিষ্ট আকৃতি নাই কারণ এরাও সর্বদাই অ্যামিবার মত আকার ও আকৃতি পরিবর্তন করতে থাকে। এদের দেহ স্বচ্ছ জেলির ন্যায়। তবে কখনো কখনো প্রতিকূল পরিবেশে এরা গোলাকার শক্ত আবরণে নিজেদের দেহ ঢেকে ফেলে। এ অবস্থায় একে সিস্ট বলে। এরা পরজীবী হিসাবে মানুষ, বানরজাতীয় প্রাণী, বিড়াল, কুকুর, শুকর ও ইঁদুরের বৃহদন্ত্রে বাস করে। এন্টামিবা এক ধরনের আমাশয় রোগের জন্য দায়ী।

এন্টামিবা কোষ বিভাজন ও অণুবীজ(স্পোর) সৃষ্টির মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে। স্পোরুলেশন পদ্ধতিতে একটি কোষের প্রোটোপ্লাজম বহুখন্ডে বিভক্ত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অণুবীজ বা স্পোর গঠন করে। অনুকূল পরিবেশে এরা প্রত্যেকে একটি নূতন অ্যামিবা হিসেবে বড় হয়।রোগী রোগজীবাণুটি কোন লক্ষণ ছাড়াই বহন করে । এমিবিক আমাশয় সম্পূর্ণভাবে নিরাময় করা খুব কঠিন। উপযুক্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ঔষধ খেলে এ রোগ সেরে যায় ৷

স্বাস্থ্য ঝুঁকি সৃষ্টিতে অণুজীবের ভূমিকা

ব্যাকটেরিয়া জীবাণু দেহাভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করতে পারে। অপরিষ্কার হাত জীবাণুর জন্য একটি সুবিধাজনক বাহন। যার মাধ্যমে সহজেই এরা মুখগহ্বরে ঢুকে যেতে পারে। আমরা যে জামা কাপড় ব্যবহার করি তাতে লেগে ব্যাকটেরিয়ার স্পোর স্থানান্তরিত হতে পারে।বাতাসে যে ধুলাবালি উড়ে বেড়ায় তার সাথে অতি সহজেই ব্যাকটেরিয়া বা তার স্পোর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারে।

হাত মেলানোর মাধ্যমেও ব্যাকটোরিয়া একজন থেকে অন্যজনে অতি সহজে স্থানান্তরিত হতে পারে। পচা ও বাসি খাদ্যের মাধ্যমে জীবাণু সহজেই ছড়ায়। কলেরা ও টাইফয়েব ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। ভাইরাস, ব্যাকটোরিয়া ও এন্টামিবাজনিত রোগ এক সময় খুবই ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে যেত। নিরাপদ পানির অভাবে এমন হত। যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগের কারণেও জনস্বাস্থ্যজনিত সমস্যা সৃষ্টি হয়। এসব মলমূত্রে যে জীবাণু থাকে তা ভক্ষণকারী অন্য জীব এগুলোকে ছড়িয়ে দেয়। এছাড়া বৃষ্টি বা জোয়ারের পানিতে এগুলো দূর দুরান্তে ছড়িয়ে পড়ে।

আমাদের দেশের অনেক স্থানে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা নেই এবং এসব অঞ্চলে মানুষ মাঠ বা কাঁচা পায়খানা ব্যবহার করে। এন্টামিবায় আক্রান্ত ব্যক্তির মল মাঠের মাটিতে মিশে যায়। এ মাটি হাতালে বা এ মাটিতে যে সবজি চাষ করা হয় তাতে এসব জীবাণু লেগে থাকে। সবজির ভিতরেও এরা প্রবেশ করে। রান্নার পরও দেখা যায় ঐ জীবাণু তখনও বেঁচে আছে। এভাবে এন্টামিবা সংক্রামিত হয়।ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে অনেক সময় ২/৪ দিনে এমনি এমনি রোগ সেরে যায়। তবে কিছু মারাত্মক রোগ আছে যার জন্য দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

হাঁচি, কফ, থুতু ও কাশির মাধ্যমে সর্দি কাশির ভাইরাস ছড়ায়। সংস্পর্শ দ্বারা উদ্ভিদের মোজাইক রোগ ছড়ায়। আবার এইড্স রোগ একবার হলে আর নিরাময় হয় না। অসূস্থ লোকের রক্ত গ্রহণ, মাদক গ্রহণ, এক সূঁই-এ বহু লোকের ইনজেকশান গ্রহণ ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে এ রোগ ছড়ায়। মাম্পস, হাম, বসন্ত ইত্যাদি খুবই কষ্টকর রোগ। ভাইরাসজনিত এসব রোগ বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় এবং আমাদের শ্বাসনালিতে প্রবেশ করে। এভাবে নানা মাধ্যমে ভাইরাস সুস্থ দেহে প্রবেশ করে।

মানবদেহে অণুজীব সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রতিরোধ ও প্রতিকার:

ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও এন্টামিবা যেসব রোগ সৃষ্টি করে তার প্রতিরোধ ও প্রতিকার করতে হলে সম্মিলিতভাবে স্বাস্থ্য রক্ষার নিয়মগুলো যত্ন সহকারে পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দুর্বল স্বাস্থ্যের রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি বহন করে। তাই সকলের উচিত সুষম খাদ্য প্রয়োজন মতো নিয়মিত গ্রহণ করা।শুধু গোশত আর মাছ খেলেই সুষম খাদ্যের ঘাটতি পূরণ হয় না। একইসাথে তাজা শাকসবজি ও ফলমূল খেলে তবেই সুষম খাদ্যের ঘাটতি পূরণ হয়।

ভিটামিন ও খনিজ লবণ সুস্বাস্থ্য এবং রোগ প্রতিরোধের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এরপর আসে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার, স্বাস্থ্যবিধি মেনে হাত ও মুখ পরিষ্কার করা, নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করা, হাতের নখ কাটা ও সাবান ব্যবহার করে গোসল করা। রাস্তাঘাটে যত্রতত্র থুতু বা কফ না ফেলা। পথ চলতে বিশেষ করে ধুলাবালি উড়ছে এমন স্থানে চলাচলের সময় অবশ্যই মাস্ক বা রুমাল ব্যবহার করতে হবে। হাঁচি বা কাশি দেওয়ার সময় অবশ্যই মুখে ও নাকে রুমাল চাপা দিতে হবে। রুমালে সর্দি মুছলে অবশ্যই বাসায় ফিরে তা ধুয়ে ফেলতে হবে।

তোমরা সম্ভব হলে নাক ঝাড়ার জন্য টিস্যু পেপার ব্যবহার করতে পার। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহার্য কোনো কিছু ব্যবহার বা স্পর্শ এড়িয়ে চলা উচিত। খাবার পানি নিরাপদ হওয়া খুবই জরুরি। কলেরা, টাইফয়েড ইত্যাদি ব্যাকটেরিয়া সৃষ্ট রোগ থেকে বাঁচতে অবশ্যই নিরাপদ পানি ব্যবহার করতে হবে। পান করা, গোসল ও কাপড় কাচা, বাসন ধোওয়া ইত্যাদির জন্য নিরাপদ পানি ব্যবহার করা উচিত। আর্সেনিকমুক্ত টিউবওয়েলের পানি নিরাপদ। পুকুর ও নদীর পরিষ্কার পানিও ব্যবহারের পূর্বে ভালোভাবে ফুটিয়ে নিতে হবে।

আরোও পড়ুন:

দাখিল সপ্তম শ্রেনী | বিজ্ঞান | পদার্থের গঠন

দাখিল সপ্তম শ্রেনী | বিজ্ঞান | শ্বসন

দাখিল সপ্তম শ্রেনী | বিজ্ঞান | পরিপাকতন্ত্র এবং রক্ত সংবহনতন্ত্র 

মানুষ ও পশুপাখি আক্রান্ত হলে তাদের চিকিৎসা করাতে হবে। তবে ভাইরাস, যেমন বার্ডফ্লুতে আক্রান্ত পাখি মেরে মাটিতে পুঁতে রাখতে হয়। ম্যাডকাউ ও অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্ত গরু-মহিষও মেরে ফেলা উচিত কারণ এর চিকিৎসা চলাকালীন অন্যান্য পশু আক্রান্ত হতে পারে। এলাকার সবাইকে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে জীবনযাপনে উৎসাহিত করতে হবে। কীভাবে এসব জীবাণু মানবদেহে ঢুকে পড়ে এবং কী করলে এদের প্রতিরোধ করা যাবে সে সম্পর্কে নিজে ভালোভাবে জানতে হবে।

বিদ্যালয়ে, মসজিদে, মন্দিরে, খেলার মাঠে, হাটে, বাজারে যেখানে লোকসমাগম বেশি সেখানেই এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করা যায়। এ ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করাটাই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিরোধ। রোগাক্রান্ত হলে অবশ্যই রোগীকে একজন ভালো চিকিৎসকের নিকট গিয়ে পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজনে ঔষধ সেবন করতে হবে। হাতুড়ে ডাক্তারের চিকিৎসায় রোগ নিরাময়ের বদলে রোগ জটিল স্তরে পৌঁছে যায়। এ ব্যাপারে আমাদের সকলের অনেক দায়িত্ব রয়েছে।

সৃজনশীল প্রশ্ন

উদ্দীপক: সোহেলের ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়েছে। তার বাবা তাকে হাঁচি ও কাশিঁ দেওয়ার সময় রুমাল ব্যবহার করতে বললেন।

ক. ভাইরাস কি?

উত্তর : নিউক্লিক এসিড ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত অতিক্ষুদ্র পরজীবী, যা শুধু জীবিত কোষেই জীবের কিছু কিছু লক্ষণ প্রকাশ করে, এগুলোই ভাইরাস ।

খ. ভাইরাসকে অকোষীয় জীব বলা হয় কেন?

উত্তর : ভাইরাস শুধু প্রোটিন আবরণ ও নিউক্লিক এসিড নিয়ে গঠিত । ইলেক্ট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া এদের দেখা সম্ভব নয় । ভাইরাস দেহে কোষ প্রাচীর, প্লাজমালেমা, সংগঠিত নিউক্লিয়াস, সাইটোপ্লাজম ইত্যাদি কিছুই নেই । তাই ভাইরাস দেহকে অকোষীয় বলে ।

গ. সোহেলকে রুমাল ব্যবহার করতে বলার কারন ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : সোহেল ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়েছে ।আর ইনফ্লুয়েঞ্জা হলো ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট একটি রোগ এবং এটি একটি বায়ুবাহিত রোগ । বায়ুর মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে বলে এ রোগকে বায়ুবাহিত রোগ বলে । হাঁচি বা কাশি দিলে বায়ুতে এ রোগের জীবাণু মিশে যাবে এবং অন্যজনের শরীর সংক্রমিত হতে পারে । তাই হাঁচি বা কাশির সময় যদি মুখে রুমাল ব্যবহার করা হয় তবে এটি বায়ুতে মিশতে পারবে না এবং অন্যজনের শরীরে সংক্রমিত হতেও পারবে না ।এ কারণে সোহেলের বাবা হাঁচি বা কাশির সময় মুখে রুমাল ব্যবহার করতে বললেন ।

ঘ. সোহেল রোগটি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অন্যদের কীভাবে সচেতন করনে তা বিশ্লেষণ কর।

উত্তর : সোহেল যে রোগে আক্রান্ত হয়েছে সেটি ভাইরাস জনিত একটি বায়ুবাহিত রোগ। এ রোগে আক্রান্ত হলে সাধারণত সর্দি, হাঁচি ও কাশি এবং সে সঙ্গে জ্বর হয় । পুষ্টিকর খাবার- যেমন- মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, ফলমূল ও টাটকা শাকসবজি পরিমিত পরিমাণে খেলে ২/৪ দিনেই এমনি এমনি রোগটি সেরে যায়। অন্যদেরকে এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। যেমন-

১. সর্দি মোছার সময় অবশ্যই টিস্যু পেপার ব্যবহার করতে হবে। ব্যবহার করা টিস্যু যেখানে-সেখানে না ফেলে সেগুলো অবশ্যই আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাহলে বায়ুতে এ রোগের জীবাণু মিশতে পারবে না এবং অন্য জনের শরীরে এ রোগ বিস্তার করতে পারবে না ।

২. হাচি বা কাশির সময় অবশ্যই মুখে রুমাল দিতে হবে। রোগির ব্যবহার করা রুমাল বা অন্যান্য কাপড় সাবান দিয়ে ধুয়ে বা সিদ্ধ করে নিতে হবে, তাহলে অন্যজনের শরীরে এ রোগ সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে ।

৩. বাসি বা পচা খাবার না খেয়ে পরিমিত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার জন্য জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

৪. এ রোগ কীভাবে ছড়ায় তা নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য পাড়ায় পাড়ায় নিয়মিত আলাপ-আলোচনা করতে হবে । তাহলে জনগণ এ রোগ সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে শিখবে এবং এর প্রকোপ থেকে সহজেই জাতি রক্ষা পাবে। এভাবে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে জনগণ এ রোগটির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সহজেই মুক্তি পাবে।

তো শিক্ষার্থী বন্ধুরা,  আমাদের আজকের পাঠ আলোচনা এই পর্যন্তই আশা করি তোমরা সম্পূর্ণ আলোচনা সঠিকভাবে পড়ছো এবং প্রশ্নগুলো সমাধানের চেষ্টা করার মাধ্যমে তোমরা নিজেদেরকে যাচাই করার সুযোগ পেয়েছো৷  এতে করে তোমাদের উপকার হবে এটাই আমাদের লক্ষ ও আমরা আশা এবং চেষ্টা  করি তোমাদেরকে সঠিক ও সহজ ভাবে সকল প্রশ্নের সমাধান করে দেয়ার৷ পরবর্তী কোন পাঠ  আলোচনায় দেখা হবে আবার।  সে পর্যন্ত সবাই ভালো ও সুস্থ থাকবে এই কামনাই করি৷ 

আল্লাহ হাফেজ! 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button