কৃষিশিক্ষা

কৃষি প্রযুক্তি | কৃষি শিক্ষা। অষ্টম শ্রেনী

আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ।  বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ৷ যেদিন থেকে এদেশের জন্ম ঠিক সেই দিন থেকেই কৃষিই দেশের অর্থনীতির খুব বড় একটা অংশকে আগলে রেখেছে৷ কৃষির ওপরেই এদেশের অর্থনীতি অনেকটা দাড়িয়ে আছে। তাই আমরা অবশ্যই চাইবো এই কৃষিকে উন্নত করতে।  যাতে করে আমাদের ফসলে আয় বাড়ে। প্রযুক্তির উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া।  একটি নতুন প্রযুক্তির আবিষ্কার হওয়ার পর কিছুদিন মানুষ সেটা ব্যবহার করে। তারপর যখন এর থেকেও উন্নয়ন প্রযুক্তির উদ্ভাবন হয়৷ তখন মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন উন্নত প্রযুক্তিরই ব্যবহার শুরু করে। যেমন ধরা যায়, সার একটি রাসায়নিক প্রযুক্তি।  এরকম সর্বদাই নতুন প্রযুক্তি পুরাতন প্রযুক্তির যায়গাটা নিজের করে নেয়।

কৃষিতে বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার

ধান চাষে গুটি ইউরিয়ার ব্যবহার

গুটি ইউরিয়ার পরিচয়: ধান চাষে অনেক সার ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে নাইট্রোজেন সম্বলিত ইউরিয়া প্রধান। দানাদার ইউরিয়া সারের সাশ্রয়ী ব্যবহারের জন্য মেশিনের সাহায্যে এটাকে গুটি ইউরিয়ায় রূপান্তর করা হয়েছে।

গুটি ইউরিয়ার প্রয়োজনীয়তা

প্রচলিত দানাদার ইউরিয়া ব্যবহারের অসুবিধা থেকেই গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তাই এখানে প্রথমে প্রচলিত দানাদার ইউরিয়ার সুবিধা ও অসুবিধা আলোচনা করা হলো। পরে গুটি ইউরিয়া সারের সুবিধা ও অসুবিধা তুলে ধরা হবে।

দানাদার ইউরিয়া ব্যবহারের সুবিধা

  1. এটি প্রয়োগ করা খুব সহজ।
  2. প্রয়োগে সময় ও শ্রম কম লাগে।
  3. গাছের মূল বা শিকড় ক্ষতিগ্রস্থ হয় না।
  4. বাজারে সহজ লভ্য।

দানাদার ইউরিয়া ব্যবহারের অসুবিধা

  1. দানাদার ইউরিয়া কিস্তিতে কয়েক বার প্রয়োগ করতে হয়।
  2. এই সার পানিতে মিশে দ্রুত গলে এবং চুঁইয়ে মাটির নিচে গাছের শিকড় অঞ্চলের বাইরে চলে যায়।
  3. বৃষ্টি বা সেচের পানির সাথে এই সার সহজেই ক্ষেত হতে বের হয়ে যায়।
  4. এই সার ব্যবহারে অপচয় এবং খরচ বেশি হয়।

 

গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের সুবিধা

  1. গুটি ইউরিয়া ফসলের এক মৌসুমে একবার ব্যবহার করা হয়।
  2. গুটি ইউরিয়ার ব্যবহারের ২০-৩০ ভাগ নাইট্রোজেনের সাশ্রয় হয়।
  3. গুটি ইউরিয়া ধীরে ধীরে গাছকে নাইট্রোজেন সরবরাহ করে।
  4. গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে ফলন ১৫-২০ ভাগ বৃদ্ধি পায়।

গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের অসুবিধা

  1. গাছের শিকড় ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।
  2. চাহিদা অনুযায়ী গুটির আকার পাওয়া দুষ্কর।
  3. শুকনো মাটিতে প্রয়োগ করা যায় না।
  4. সার প্রয়োগ করতে সময় ও শ্রম বেশি লাগে।
ধান চাষে কোন সার ভালো?

 উত্তর : ধানের চাষের জন্য সবথেকে ভালো ও নিরাপদ  সার হল অ্যামোনিয়াম সালফেট । যেকারনে  N-ভগ্নাংশ অ্যামোনিয়াম সালফেটের অ্যামোনিয়াম আকারে সেখানে থাকে, যারা ধান চাষ করে তারা  ঘন ঘন এটি চলাচলরত কাঁদ মাটিতে ছিটিয়ে দেয় , তাই নাইট্রেটের সারগুলি ডিনাইট্রিফিকেশনের ক্ষতির কারণে একটি সাধারণ পছন্দ।

ধান চাষে ইউরিয়া তিন কিস্তিতে প্রয়োগ করা হয় কেন?
উত্তর :
  1. যাতে করে খরচ কম হয়।
  2. আগাছা নির্মূলের লক্ষ্যে।
  3. চারার রোগ  নিরাময়ের জন্য।
  4. রাসায়নিক সার কম খরচের জন্য।
ধান চাষে গুটি ইউরিয়ার প্রয়োগ পদ্ধতি

 

গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের পাঁচ থেকে সাত দিন পূর্বে ২০×২০ সে.মি. লাইন থেকে লাইন এবং চারা থেকে চারার দূরত্বে ধানের চারা রোপণ করতে হবে। ধানের চারা রোপণের ৫-৭ দিনের মধ্যে মাটি শক্ত হওয়ার আগে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করা জরুরি। জমিতে যখন ২-৩ সে.মি. পরিমাণ পানি থাকে সে সময় গুটি ইউরিয়া ব্যবহার সহজ হয়।

গুটি ইউরিয়ার ওজন বিভিন্ন রকমের হয়। যথা: ০.৯ গ্রাম, ১.৮ গ্রাম এবং ২.৭ গ্রাম। ওজন অনুযায়ী ধান ক্ষেতে ব্যবহারের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। ওজন যদি ০.৯ গ্রাম হয় তবে চারটি গোছার মাঝখানে বোরো ধানে ৩টি এবং আমন ও আউশে ২টি করে ব্যবহার করতে হবে। ওজন যদি ১.৮ গ্রাম হয় তবে বোরোতে ২টি এবং আমন-আউশে ১টি করে ব্যবহার করতে হবে। আবার ওজন যদি ২.৭ গ্রাম হয় তবে বোরোতে ১টি গুটি প্রয়োগই যথেষ্ট।

গুটি ইউরিয়া লাইনে চাষ করা ক্ষেতে প্রয়োগ করা সুবিধাজনক। প্রথম লাইনের প্রথম চার গোছার মাঝে ১০ সেমি. গভীরে গুটি ইউরিয়া পুঁতে দিতে হয়। এরপর চার গোছা বাদ দিয়ে পরবর্তী চার গোছার মাঝে একই গভীরতায় পুঁতে দিতে হবে। প্রথম লাইন শেষ করে দ্বিতীয় লাইনে, তৃতীয় লাইনে, চতুর্থ লাইনে গুটি ইউরিয়া পুঁতে দিতে হবে। এভাবে সমগ্র ক্ষেতে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে।

ইউরিয়া সার প্রয়োগ করার নিয়ম কি?

উত্তর : ক্ষেত বা মাঠ ভালোভাবে দেখে নিয়ে এবং ধানের জাত অনুযায়ী গুটি ইউরিয়ার কতটুকু পরিমাণ দেয়া উচিত তা বের করা যায়। আর ধানের চারা রোপণের ১-২ সপ্তাহ পর গাছের গোড়া থেকে ৪-৫ ইঞ্চি দূরে   ২-৩ ইঞ্চি মাটির গভীরে ছিটিয়ে  ঢেকে দিতে হবে। একই সাথে অবশিষ্ট এমওপি সার দিতে হবে। ধানের পাশাপাশি আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, কলা, বেগুন, ভুট্টা ও টমেটো চাষে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করা যায়।

গরু মোটাতাজাকরণ

আমাদের দেশে ধানের ও শাক-সবজির উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও পশু সম্পদের উন্নতি তেমন হয়নি। একটা কথা মনে রাখা দরকার যে পশু-সম্পদের উন্নতি না হলে জনগণকে প্রয়োজনীয় আমিষ সরবরাহ করা যাবে না। কারণ একজন মানুষের দৈনিক ১২০ গ্রাম মাংসের প্রয়োজন হয়। কিন্তু একটি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষ দৈনিক মাথাপিছু ২৪ গ্রাম মাংস খেয়ে থাকে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে আমাদের দেশে প্রাণীজ আমিষ সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে গো-মাংসের সরবরাহ বৃদ্ধি করা উচিত। এ সমস্যা দূরীকরণের লক্ষেই গরু-বাছুর মোটাতাজাকরণের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অল্প সময়ে গরুকে মোটাতাজা করে অধিক মূল্যে বাজারজাত করা হয় এবং অধিক লাভ পাওয়া যায়।

গরু মোটাতাজাকরণ পদ্ধতি

মোটাতাজাকরণ পদ্ধতির উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো:

  • গরু নির্বাচন ও ক্রয় করা: বলদ গরু মোটাতাজাকরণের জন্য ভালো। এ জন্যে দেড়-দুই বছর বয়সের এঁড়ে বাছুর ক্রয় করা উত্তম।
  • বাসস্থান নির্মাণ: প্রতিটি গরুর জন্য ১.৫ মি. × ২ মি. জায়গায় ঘর নির্মাণ করতে হবে।
  • রোগ ব্যাধির চিকিৎসা : এ ব্যাপারে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। সংক্রামক রোগের টিকা দেওয়া জরুরি।
  • খাদ্য সরবরাহ : পশুকে এমন খাদ্য দিতে হবে যাতে আমিষ, শর্করা, চর্বি, খনিজ পদার্থ ও ভিটামিনের পরিমাণ খাদ্যে বেশি থাকে।

মোটাতাজাকরণে খাদ্য তৈরি প্রক্রিয়া: পশু মোটাতাজাকরণ অর্থ হচ্ছে পরিমিত খাদ্য সরবরাহের মাধ্যমে গরুর স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা এবং মানুষের জন্য আমিষ সরবরাহের ব্যবস্থা করা। খাদ্য থেকে পশু পুষ্টি পায় এবং শারীরিক বৃদ্ধি ঘটে। পশুকে এমন খাদ্য দিতে হবে যাতে আমিষ, শর্করা, চর্বি, খনিজ পদার্থ ও ভিটামিন সাধারণ খাদ্যের চেয়ে একটু বেশি পরিমাণ থাকে। খড়, কুড়া, ভুট্টা বা গম ভাঙা, ঝোলাগুড়, খৈল ইত্যাদিতে আমিষ, শর্করা ও চর্বি জাতীয় খাদ্য থাকে। আর সবুজ কাঁচা ঘাস, হাড়ের গুঁড়া ইত্যাদিতে খনিজ লবণ ও ভিটামিন থাকে। সহায়ক। এগুলো দুইভাবে মিশিয়ে ইউরিয়া ও ঝোলাগুড় মেশানো খাদ্য পশু মোটাতাজাকরণের খাওয়ানো যায়

(১) খড়ের সাথে মিশিয়ে এবং

(২) দানাদার খাদ্যের সাথে মিশিয়ে।

খড়ের সাথে ইউরিয়া মিশিয়ে গো-খাদ্য তৈরি

  • প্রথমে একটি ডোল নিয়ে এর চারপাশ কাদা মিশিয়ে লেপে শুকিয়ে নিতে হবে।
  • এরপর একটি বালতিতে ২০ লিটার পানি নিতে হবে।
  • এই পানিতে ১ কেজি ইউরিয়ার দ্রবণ তৈরি করতে হবে।
  • ২০ কেজি খড় ডোলের মধ্যে অল্প অল্প করে দিয়ে ইউরিয়া দ্রবণ খড়ের উপর ছিটিয়ে চেপে চেপে ভরতে হবে।
  • এভাবে সম্পূর্ণ ডোল খড় দিয়ে ভরতে হবে।
  • ডোলে খড় ভরা সম্পূর্ণ হলে এর মুখ ছালা বা পলিথিন দিয়ে বেঁধে দিতে হবে।
  • ১০ – ১২ দিন পর খড় বের করে রোদে শুকাতে হবে।
  • এরপরই খড় গরুকে খাওয়ানোর উপযুক্ত হবে।
  • সাধারণ একটি গরুকে প্রতিদিন ৩ কেজি ইউরিয়া মেশানো খড় খাওয়াতে হবে।
  • খড়ের সাথে দৈনিক ৩০০-৪০০ গ্রাম ঝোলাগুড় মিশিয়ে দিতে হবে।

গরু মোটাতাজা করার জন্য কোন শস্য ভালো?

উত্তর : গরু ওনবাছুরকে তার উড়তি বয়সে যখন সঠিকভাবে খাওয়ানো হয় তখন তাদের দেহ অনেক তারাতাড়ি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।  এবং তারা লম্বা ও চওড়া হতে শুরু করে।   পুরো তুলা বীজ এবং ভুট্টা সেগুলি প্রায়শই তাদের খাওয়ানোর জন্য বলা হয়  কারণ তা শক্তি ঘন এবং চর্বিযুক্ত। সম্পূর্ণ তুলাবীজ বিশেষভাবে সহায়ক কারণ এটি হজম স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য ফাইবার সরবরাহ করে এবং প্রজনন গাভীতে প্রজনন স্বাস্থ্যকে সহয়তা করে।

সাইলেজ কি?

উত্তর : সাইলেজ হচ্ছে সবুজ ঘাস সংরক্ষণ করার একটি পদ্ধতি। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুকরণ করে সবুজ ঘাসের পুষ্টি উপাদান সঠিক মাত্রায় বের করে নেয়ার জন্য বায়ুশূন্য অবস্থায় সবুজ ঘাসকে ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে  রাখার প্রক্রিয়াকে সাইলেজ বলা হয়। সাইলেজ পুষ্টিকর একটি গাবাদি পশুর খাদ্য , যার বহুবিধ উপকারিতা বিদ্যমান ।

তো শিক্ষার্থী বন্ধুরা আমাদের আজকের এই পাঠ আলোচনা এই পর্যন্তই।  আশা করি তোমরা আজকের এই পাঠ আলোচনা থেকে অনেক কিছু শিখতে ও জানতে সক্ষম হয়েছো।  আবার দেখা হবে নতুন কোন পাঠ আলোচনায় সে পর্যন্ত সবাই ভালো ও সুস্থ থাকবে এই কামনাই করি ।

আল্লাহ হাফেজ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button