কৃষিশিক্ষা

কৃষি ও জলবায়ু | কৃষি শিক্ষা | অষ্টম শ্রেনি

প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা কেমন আছো তোমরা।  আশা করি প্রত্যেকে অনেক ভালো আছো।  আবারো তোমাদের মাঝে চলে আসলাম নতুন একটি পাঠ আলোচনা নিয়ে৷ আজকে আমরা আলোচনা করবো তোমাদের কৃষি শিক্ষা বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় “কৃষি ও জলবায়ু!” নিয়ে আশা করি তোমরা আজকের পাঠ আলোচনা সম্পূর্ণ পড়বে এবং অনেক কিছু শিখার ও জানান চেষ্টায় মগ্ন থাকবে। তো চলো শুরু করা যাক –

কৃষির ক্ষেত্রে দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রভাব বিদ্যমান।  কৃষি উৎপাদন যার ওপর নির্ভর করে সেটা হলো জলবায়ু৷ বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে প্রতিকূল পরিবেশ গুলো হলো:- খরা,লবনাক্ত ও বন্যাপ্রবণ এলাকার শস্য, মৎস ও পশুপাখির উৎপাদন করায় তার থেকে কৃষি যেমন লাভবান হয় তেমনি কিছুটা ক্ষতিসাধনও হয়। আরো কিছু ক্ষতিকর আবহাওয়া বিদ্যমান – জলাবদ্ধতা, অতিবৃষ্টু,অনাবৃষ্টি,শিলাবৃষ্টির থেকে কৃষি ফসল ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন  হয়।

ফসল উৎপাদনে প্রতিকূল পরিবেশ 

 

জলবায়ু ও পরিবেশগত উপাদান স্বাভাবিক থাকলে ফসলের বৃদ্ধি ও বিকাশ স্বাভাবিকভাবে হয়ে থাকে। তবে প্রকৃতি সব সময় স্বাভাবিক থাকে না। কিছু কিছু অঞ্চলে উৎপাদন মৌসুমে ফসলকে জলবায়ু ও পরিবেশগত নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এ অবস্থাকে প্রতিকূল পরিবেশ বলে। এ ধরনের অবস্থায় ফসল জৈব-রাসায়নিক ও শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। একে ফসলের অভিযোজন ক্ষমতা বলে। আমরা জানব জলবায়ু ও পরিবেশের কোন উপাদানগুলো ফসল উৎপাদনের জন্য প্রতিকূল পরিবেশে সৃষ্টি করে।

প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টিকারী জলবায়ুগত উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে- 

  • বন্যা বা জলাবদ্ধতা
  • অনাবৃষ্টি বা খরা
  • উচ্চ তাপ
  • নিম্ন তাপ

আর পরিবেশগত উপাদানের মধ্যে রয়েছে-

  • মাটির লবণাক্ততা
  • মাটিতে বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি
  • বাতাসে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি

 

বাংলাদেশের কৃষিতে প্রতিকূল পরিবেশজনিত সমস্যা অনেক আগে থেকেই ছিল। বর্তমানে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতিকূল পরিবেশজনিত সমস্যা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশের কৃষি খাতে ৩টি আশঙ্কাজনক ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে-

  • খরা
  • লবণাক্ততা
  • বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃষ্টিপাত অনিয়মিতভাবে হচ্ছে। বোরো মৌসুমে এবং আমন মৌসুমে খরার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃষ্টিনির্ভর আমন মৌসুমে সাধারণত চাষিদের সেচ দেওয়ার কোনো পূর্বপ্রস্তুতি থাকে না। ফলে নীরব খরায় ধানের ফলন হ্রাস পাচ্ছে।

বরিশাল ছিল একসময় শস্যভাণ্ডার। এখন সেই বরিশাল খাদ্য ঘাটতি এলাকা। মাটি ও পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ লাখ হেক্টর আমন আবাদি জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

ভয়াবহ বন্যায় ২০০৭ সালে দেশের প্রায় ৬০% এলাকা প্লাবিত হয়। বন্যায় আমন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই আবার আঘাত হানে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’। ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ১৩ লক্ষ টন। বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। এদেশে প্রতি বছর অন্তত ১% হারে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে ১.৩৯% হারে জনসংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে প্রতিকূল পরিবেশের মোকাবিলাও করতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে আমাদের প্রতিকূল পরিবেশে ফসল উৎপাদনের কলাকৌশল জানতে হবে।

ফসল উৎপাদনে পরিবেশের প্রভাব কি? 
উত্তর : শস্য কৃষির অভ্যন্তরীনকে প্রভাবিত করে এরকম অনেক কারন বিদ্যমান।  পরিবেশগত কারণগুলি মধ্যে রয়েছে ভূখণ্ড, জলবায়ু, মাটির বৈশিষ্ট্য এবং মাটির জল। আর এই চারটি কারণের সাথে  মিশ্রণের ফলে যা তৈরী হয় তা  নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্ট ফসল উৎপাদনের অনুমতি দিয়ে থাকে ।

ফসল উৎপাদনে তাপমাত্রার প্রভাব কি? 
উত্তর : ফসল উৎপাদন করার ক্ষেত্রে তাপমাত্রা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।  কেননা গাছ তাপের মাধ্যমে খাদ্য তৈরী করে থাকে ৷ ফসলের ওপটে তাপমাত্রার প্রভাব অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ । প্রতি ফসলের প্রজনন বৃদ্ধির জন্য নির্দিষ্ট একটি পরিসীমা থাকে। যে পরিমান তাপমাত্রা ফসলের জন্য কল্যানকর ততটার কম বেশী পেলে তখন ফসলের ক্ষতি সাধন হয়।  যখন তাপমাত্রা সীমার নিচে পড়ে বা ওপরের সীমাটি অতিক্রম করে তখন ফসলের উৎপাদন সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়। বৃষ্টিপাত শস্য উৎপাদনকে কম কিংবা বৃদ্ধি করে থাকে।

আধুনিক কৃষি কাকে বলে?
উত্তর : অতীতে এদেশের কৃষি প্রযুক্তি বিদ্যামন ছিল না। তখন লোকেরা অনেক কষ্টে ফসল উৎপাদন করতো এবং অনক  দিন যাবত বৃষ্টির জন্য অধিক আগ্রহে অপেক্ষা করতো৷ বর্তমানে আধুনিক যুগে যা বৃহৎ জনশক্তি, মূলধন ইনপুট এবং উইনোয়িং মেশিন, থ্রেসার এবং হার্ভেস্টারের মতো সরঞ্জামগুলির ব্যাপক ব্যবহার দ্বারা বৈশিষ্ট্যযুক্ত। এছাড়াও, এটি নির্বাচনী প্রজনন এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
যা কৃষির আধনিক প্রযুক্তির মধ্যে অন্যতম।

 

খরা অবস্থায় ফসল উৎপাদন কৌশল

 

ফসল উৎপাদনে প্রাকৃতিক বিপত্তিসমূহের মধ্যে খরা অন্যতম। বাংলাদেশে প্রায় সব মৌসুমেই ফসল খরায় কবলিত হয়। খরা অবস্থা তখনই বিরাজ করে যখন কোনো নির্দিষ্ট মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হয় বা দীর্ঘদিন ধরে কোনো বৃষ্টিপাত হয় না। এতে করে মাটিতে রসের ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য দেহে প্রয়োজনীয় পানির ঘাটতি অবস্থা বিরাজ করে। এ অবস্থাকে খরাকবলিত অবস্থা বলা হয়। খরার কারণে ফসলের ১৫-৯০ ভাগ ফলন হ্রাস পেতে পারে। খরা কবলিত অঞ্চলে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফসল চাষ করলে লাভজনকভাবে ফসল উৎপাদন করা যায়। ব্যবস্থাপনাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।

১. উপযুক্ত ফসল বা ফসলের জাত ব্যবহার: খরা শুরু হওয়ার আগেই ফসল তোলা যাবে এমন স্বল্পায়ু জাতের অথবা খরা সহ্য করতে পারে এমন জাতের চাষ করতে হবে, যেমন- আমন মৌসুমে বিনা ধান ৭, ব্রি ধান ৩৩ এক মাস আগে পাকে। ফলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের খরা থেকে ফসল রক্ষা করা যায়। আবার আমন মৌসুমের ব্রি ধান ৫৬, ব্রি ধান ৫৭ যেমন স্বল্পায়ু জাত তেমন ২১-৩০ দিন খরা সহ্য করতে পারে। বিজয়, প্রদীপ ও সুফী হলো গমের তিনটি খরা সহনশীল জাত। খরা প্রবণ এলাকায় আগাম জাতের আমন চাষ করে ফসল কাটার পর জমিতে রস থাকতেই ছোলা, মসুর, খেসারি, সরিষা, তিল ইত্যাদি খরা সহনশীল ফসল চাষ করে একটি অতিরিক্ত ফসল তোলা যাবে। কুল গাছ খরা সহনশীল বলে এসব অঞ্চলে কুল বাগানও করা যেতে পারে।

২. মাটির ছিদ্র নষ্টকরণ : খরা প্রবণ এলাকায় বৃষ্টির মৌসুম শেষ হওয়ার পর মাটিতে জো আসার সাথে সাথে অগভীর চাষ দিয়ে রাখতে হবে। এতে মাটির উপরিভাগের সূক্ষ্ম ছিদ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে সূর্যের তাপে মাটির রস শুকিয়ে যাবে না।

৩. অগভীর চাষ: জমি চাষের সময় মাটির আর্দ্রতা কম মনে হলে জমিকে হালকা চাষ দিতে হবে। প্রতি চাষের পর মই দিয়ে মাটিকে আঁটসাঁট অবস্থায় রাখতে হবে। এতে মাটিতে পানির সাশ্রয় হবে।

৪. জাবড়া প্রয়োগ : শুকনা খড়, লতাপাতা, কচুরিপানা দিয়ে বীজ বা চারা রোপণের পর মাটি ঢেকে দিলে রস সংরক্ষিত থাকে। কারণ সূর্যের তাপে পানি বাষ্পে পরিণত হতে পারে না। অনেক দেশে কালো পলিথিনও ব্যবহার করা হয়। এতে আগাছার উপদ্রবও কম হয়।

৫. পানি ধরা : যে অঞ্চলে বৃষ্টি খুব কম হয়, সে অঞ্চলে বৃষ্টির মৌসুমে জমির বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট নালা বা গর্ত তৈরি করে রাখা হয়। এর ফলে পানি গড়িয়ে জমির বাইরে চলে যায় না। পানি সংরক্ষণের এ পদ্ধতিকে পানি ধরা বলা হয়। বৃষ্টির মৌসুম শেষ হওয়ার সাথে সাথে জমি চাষ দিয়ে ফসল বুনে সংরক্ষিত এ পানি সফলভাবে ব্যবহার করা যায়।

৬. আঁচড়ানো : মাটির রস দ্রুত শুকিয়ে যেতে থাকলে বীজ গজানোর পর পর উপরের মাটি হালকা করে আঁচড়ে দিলে মাটির ভিতরে রস সংরক্ষিত থাকে।

৭. সারির দিক পরিবর্তন: খরা প্রবণ এলাকায় সূর্যালোকের বিপরীত দিকে সারি করে ফসল লাগানো উচিত। এতে গাছ একটু বড় হলে ফসলের ছায়া দুইসারির মাঝে পড়ে। ফলে মাটিস্থ পানির বাষ্পীভবন কম হয়। পানির অপচয় কম হয়।

৮. জৈব সার ব্যবহার: জমিতে বেশি করে জৈব সার ব্যবহার করলে মাটির গঠন উন্নত হয়, মাটি ঝুরঝুরে হয়। ফলে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বেড়ে যায়।

খরা হলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয় কেন?

উত্তর : কৃষিতে খরার সময় ফসল উৎপাদন করাটা অনেকাংশে ঝুঁকির কারন হয়ে দাড়ায়। এই অবস্থাটি বৃষ্টিপাতের মাত্রার যে কোনো পরিবর্তন হয়েও প্রকাশিত হতে পারে যখন কৃষি খরা হয় তখন বর্ধিত সেচ বা মাটির বর্তমান অভ্যন্তরীন অবস্থা এবং দুর্বল পরিকল্পিত কৃষি প্রচেষ্টার কারণে ফসলের ক্ষয় হয় এবং পানির ঘাটতি ঘটায়। যার ফলে খরার সময় ফসল উৎপাদন করাটা আর হয়ে ওঠে না।

উদ্ভিদের ওপর খরা চাপ কিভাবে সৃষ্টি হয়?

উত্তর : যেসব অঞ্চলগুলোতে খরা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেইসব এলাকার কৃষকদের সতেচন অনুযায়ী খরা সহনশীল ফসল উৎপাদন করা উচিত।  খরা হলে তখন মাটি ফেটে যায় যার ফলে উদ্ভিদদের অবস্থানরত জমির মাটি ফেটে গেলে তখন উদ্ভিদদের বেচে থাকাটাই কষ্ট হয়ে ওঠে। আবার খরা হওয়া অবস্থায় পানির খুবই অভাব দেয়ার ফলে উদ্ভিদরা শেষ পর্যন্ত মারাই যায়।

বৃষ্টি নির্ভর ফসল কোনটি?

উত্তর :যে ফসলগুলো বৃষ্টির সময় কোন ক্ষতি সাধন না করে বরং বৃষ্টির সময়টাতে অনেক তাড়াতাড়ি বেড়ে ওঠে সেগুলো হলো বৃষ্টি নির্ভর ফসল। অনেকগুলে বর্ষাকালীন ফসল যা বর্ষাকালে বৃষ্টির জলের উপর নির্ভর করে চাষ করা হয়। যেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো  ধান, পাট, ভুট্টা, আখ, ইত্যাদি । এগুলোই বৃষ্টি নির্ভর ফসল। 

 

তো শিক্ষার্থী বন্ধুরা,  আমাদের আজকের এই পাঠ আলোচনা এই পর্যন্তই।  তোমারা যেনো খুব সহজেই বুজতে পারো সেভাবেই আমার পাঠ আলোচনা গুলো করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকি। আশা করি তোমরা আজকের পাঠ আলোচনা থেকে অনেক কিছু জানতে ও শিখতে সক্ষম হয়েছো।  আবার দেখা হবে নতুন কোন পাঠ আলোচনায় সে পর্যন্ত সবাই ভালো ও সুস্থ থাকবে এই কামনাই করি।

আল্লাহ হাফেজ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button