কৃষিশিক্ষা

কৃষি উপকরণ | কৃষি শিক্ষা | অষ্টম শ্রেনি

প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা কেমন আছো তোমরা।  আশা করি সকলে অনেক ভালো আছো।  আবারো তোমাদের মাঝে চলে আসলাম নতুন একটি পাঠ আলোচনা নিয়ে। আজকে আমরা আলোচনা করবো তোমাদের কৃষি শিক্ষা বইয়ের “কৃষি উপকরণ ” নিয়ে। আশা করি তোমরা সম্পূর্ণ পাঠ আলোচনা মনযোগ সহকারে পড়বে এবং কিছু শিখার ও জানার চেষ্টা করবে। তো চলো শুরু করা যাক –

আজকে আমরা মূলত আলোচনা করবো বীজ বপনের উপযুক্ত মাটি প্রস্তুত করা, আদর্শ বীজতলা তৈরী ও তার রক্ষণাবেক্ষণ এবং সাশ্রয়ীরূপে সার ব্যবহার করা ইত্যাদি বিষয়  নিয়ে।  বীজতলার মাটি যদি উপযুক্তভাবে তৈরী করা না যায় তবে অনেক বীজ গজাবে না। সচরাচর দেখা যায় বীজতলা তৈরী ও রক্ষণাবেক্ষণ করানো হলে উপযুক্ত মাটি থাকা সত্ত্বেও যারা ভালোভাবে হয় না। আরেকটি বিষয় হলো জমিতে সার প্রয়োগ করতে অধিকাংশ কৃষক নিয়মের অনুকরন করেন না।  যার ফলে সারের অপচয় সহ অর্থনৈতিকভাবে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই আমরা আজকে এই বিষয় গুলি কিভাবে ঠিক করা যায় তা নিয়েই আলোচনা করবো।

নার্সারিতে বীজ বপনের উপযুক্ত মাটি প্রস্তুত

তোমরা জানো যে, বীজতলায় বীজ উৎপাদন করা হয়।  বীজ তলার মাটি ভালোভাবে প্রস্তুত না করে বীজ বপন করলে ভালো চারা উৎপন্ন হয় না।

বীজতলার মাটি প্রস্তুত করার জন্য যে যে উপকরণ লাগবে তা হলো- জমি, খুঁটি, জায়গা মাপার ফিতা, কোদাল, জৈব ও অজৈব সার ইত্যাদি। আমাদের দেশে দুই ধরনের বীজতলা তৈরি করা হয়। যথা-

  • (ক) শুকনো
  • (খ) ভেজা।

শুকনো বীজতলায় সরাসরি বীজ বপন করা যাবে। তবে ভেজা বীজতলার ক্ষেত্রে মাটি পানি দ্বারা ভিজিয়ে কাদা করে সমান করতে হবে। অতঃপর বীজ বপন করতে হবে। বীজতলার মাটি প্রস্তুতির নিয়মগুলো হলো-

  •  বীজতলার চারপাশে ৩০ সে.মি. চওড়া ও ১৫ সেঃমিঃ গভীর নালা তৈরি করতে হবে।
  • বীজতলার মাটি ২০-২৫ সে.মি. উঁচু রাখতে হবে।
  • ১৫-২০ সে.মি. গভীর করে বীজতলার মাটি চাষ করতে হবে।
  • এ অবস্থায় মাটি ২-৪ দিন রেখে দিলে মাটিতে রোদ লাগবে, পোকা বের হলে পাখি খেয়ে ফেলবে।
  • এরপর ঘাস, শিকড়, পাথর ইত্যাদি বেছে ফেলে দিতে হবে।
  • মাটি এঁটেল হলে অন্য জায়গা থেকে দোআঁশ মাটি এনে বীজতলায় মেশাতে হবে, কিন্তু মাটি বেলে হলে জৈব পদার্থ ও দোআঁশ বা এঁটেল মাটি যোগ করতে হবে।
  • বৃষ্টির পানি বা বাতাসে মাটি সরে যেতে পারে সেজন্য চারপাশে ছিদ্র করা ইট বা অন্য কিছু দিয়ে ঘিরে দিলে ভালো হয়।
  •  বীজতলার দলা বা ঢেলা ভেঙে ঝুরঝুরা করে মাটি সমান করতে হবে।
  • বীজ বপনের ১০-১২ দিন আগে বীজতলায় টিএসপি, এমওপি ও পচা শুকানো গোবর বা আবর্জনা সার মিশিয়ে দিতে হবে।
  • নার্সারির আকার অনুযায়ী সার প্রয়োগ করতে হবে।
  • বীজতলার মাটিতে পোকা বা রোগ জীবাণু থাকতে পারে। তাই কিছু খড় বিছিয়ে দিয়ে তাতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিলে মাটি কিছুটা জীবাণুমুক্ত হবে।
  • মাটি শোধনের জন্য গ্যামাক্সিন বা ফরমালডিহাইড জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করা যেতে পারে।

পলিব্যাগে ভরার জন্য মাটি: উপরোক্ত নিয়মে প্রস্তুতকৃত মাটি চালনি দ্বারা চেলে ঢেলামুক্ত করতে হবে। তারপর নির্ধারিত মাপের পলিব্যাগে মাটি ভরাট করতে হবে।

বীজতলা কিভাবে তৈরী করতে হয়?

উত্তর : বীজ বপনের করার কিছুদিন   আগের থেকেই বীজতলার মাটি ২০-২৫ সেন্টিমিটার গভীর করে ঝরঝরা ও ঢেলা মুক্ত করে সৃষ্টি করতে হবে। বীজতলা সাধারণত ১০-১৫ সেন্টিমিটার উঁচু করে তৈরি করতে হয়। মাটি, বালু ও পচা গোবর-সার বা কম্পোস্ট মিশিয়ে বীজতলার মাটি তৈরি করতে হয়। তাছাড়া মাটি উর্বর হলে রাসায়নিক সার না দেওয়াই উত্তম।

স্থানীয় নার্সারি জন্য কি ধরনের মাটি প্রয়োজন?

উত্তর : নার্সারীর মাটি সর্বদা উর্বর হওয়া আবশ্যক। নার্সারী অবশ্যই উঁচু জায়গায় তৈরী করতে হবে যাতে করে বন্যার পানি নার্সারীতে কখনই প্রবেশ করতে না পারে। নার্সারীর মাটি যেন অতিরিক্ত পানি শোষণ  করতে পারে  যাতে অতিবৃষ্টিতে  নার্সারীর বেডে পানি জমে না থাকে।

বীজ বপনের জন্য মাটি প্রস্তুতি কিভাবে করে?

উত্তর : বীজ বপনের আগেই যে মাটি প্রস্তুত করা হয় তাকে বীজতলা বলে । পানি এবং সার শোষণ বাড়ানোর জন্য মাটি আলগা করা হয় । মাটিরগুলো ঝরঝরে   করে নিলে মাটিতে হিউমাস এবং পুষ্টি যোগ হয় যা ফসলের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে । লাঙল দিয়ে মাটি কাটা  করা হয় যা অতীতকালে একজোড়া ষাঁড় দ্বারা টানা হতো।  এখন নানান ধরনের কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব কাজ গুলো সম্পূর্ন করা হয়।

আদর্শ বীজতলা তৈরী

বীজতলা বিভিন্ন আকারের হতে পারে। এখন আমরা একটি আদর্শ বীজতলা সম্পর্কে জানব। এ ধরনের বীজতলার  আকার-আকৃতি, সার প্রয়োগ, মাটি প্রস্তুত ও রক্ষণাবেক্ষণ সঠিক নিয়মে হয়ে থাকে। শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে আদর্শ বীজতলার একটি মডেল চিত্র দেখাবেন। মডেল চিত্র দেখে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে তা আঁকতে বলবেন। এরপর শিক্ষক আদর্শ বীজতলার নিয়মাবলি উল্লেখ করবেন।

(ক) ধান ফসলের বীজতলা : বীজতলায় বীজ বপন করে চারা উৎপাদন করা হয় এবং রোপণের আগ পর্যন্ত চারার যত্ন নেওয়া হয়। তাই ধানের আদর্শ বীজতলা তৈরির জন্য জমি চাষ ও মই দিতে হয়। সাধারণত বীজতলা দুইভাবে তৈরি করা হয়। যথা- ভেজা কাদাময় বীজতলা ও শুকানো বীজতলা। শুকানো বীজতলা উঁচু বেলে দোআঁশ মাটিতে এবং ভেজা কাদাময় বীজতলা এঁটেল মাটিতে তৈরি করা হয়। গাছের ছায়া পড়ে না ও বর্ষার পানিতে ডুবে যায় না, এমন জমি বীজতলার জন্য নির্বাচন করা হয়।

আদর্শ বীজতলার গঠন: (ধান ফসল)

  • প্রতিটি বীজতলার আকার হবে ৯.৫ মিটার x ১.৫ মিটার এবং খুঁটি দিয়ে তা চিহ্নিত করতে হবে।
  • দুইটি বীজতলার মাঝে ৫০ সে.মি ও বীজতলার চারপাশে ২৫ সে.মি পরিমাণ জায়গা নালা তৈরি করার জন্য রাখতে হবে।
  • দুইটি বীজতলার মাঝের ও চারপাশের জায়গা থেকে মাটি তুলে বীজতলা ৭-১০ সে.মি. উঁচু করতে হবে।
  • বীজতলার প্রতি বর্গমিটারে ২ কেজি হারে গোবর বা কম্পোস্ট সার প্রয়োগ করে বীজতলার মাটির সাথে মেশাতে হবে।

(খ) উদ্যান ফসলের বীজতলা: নার্সারিতে উদ্যান ফসলের বীজ/চারা/স্টাম্প (Stump) বপন বা রোপণ করে মূল জমিতে রোপণের উপযোগী করে তোলা হয়। এর ফলে চারার স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত হয় এবং অল্প জায়গায় সুষম পরিচর্যার মাধ্যমে বেশি চারা উৎপাদন করা হয়।

আদর্শ বীজতলার গঠন: (উদ্যান ফসল)

(১) নার্সারির বেড তৈরির জন্য সুনিষ্কাশিত উঁচু, আলো-বাতাসযুক্ত উর্বর জমি নির্বাচন করতে হবে।

(২) প্রতিটি বেডের আকার হবে ৩ মিটার x ১ মিটার এবং খুঁটি দিয়ে তা চিহ্নিত করতে হবে।

(৩) কোদাল দিয়ে ভালোভাবে কুপিয়ে বেড তৈরি করতে হবে।

(৪) প্রতিটি বেডে ২৫ কেজি গোবর বা কম্পোস্ট সার দিয়ে মাটির সাথে উত্তমরূপে মেশাতে হবে।

(৫) পাশাপাশি দুইটি বেডের সাথে ৫০ সে.মি. নালা তৈরি করতে হবে।

(৬) নালার মাটি পাশাপাশি দুইটি বেডে ভাগ করে দিতে হবে যেন বেডের উচ্চতা ভূমি থেকে ১০ সে.মি. উঁচু হয়।

(৭) এরপর প্রতি ৩ বর্গমিটার বেডের জন্য ১৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম টিএসপি, ১০০ গ্রাম এমওপি সার ছিটিয়ে মাটির সাথে মেশাতে হবে।

(৮) মাটি অধিক অম্লীয় হলে বেড প্রতি ১৫০ গ্রাম চুন প্রয়োগ করতে হবে।

(৯) রশি, খুঁটি • সরিয়ে বেডের উপরের মাটি সমান করে বীজ বপন করতে হবে।

একটি আদর্শ বীজতলার দৈর্ঘ্য কত?

উত্তর : সাধারণত একটি আদর্শ বীজতলা হয় এক মিটার প্রস্থের  এবং তিন মিটার দৈর্ঘ্যের।

আদর্শ বীজতলা বলতে কি বুঝ?

উত্তর : বীজতলা বলতে আমরা বীজ রোপণের স্থানকে বুজি।  বীজ রোপেনের কয়েকদিন আগে যে স্থান বীজরোপণের জন্য প্রস্তুত করা হয় তাকে বীজতলা বলা হয়।  কাজের সুবিধার জন্য একটি আদর্শ বীজতলার মাপ সাধারণতঃ ৩ মিটার দীর্ঘ (১০ ফুট) ও ১মিটার প্রস্থ (৩ ফুট) হওয়া প্রয়োজন।

সবচেয়ে ভালো বীজতলা কোনটি?

উত্তর: আদর্শ বীজতলা সমান্তরাল দৃঢ়, পৃষ্ঠের কাছাকাছি মাটির আর্দ্রতা রয়েছে, প্রতিযোগীতামূলক  গাছপালা থেকে ভিন্ন এবং মাটির ক্ষয় রোধ করার জন্য ছোট পৃষ্ঠের ক্লোড বা অবশিষ্টাংশের হালকা মালচ দিয়ে ভালভাবে প্যাক করা হয়। যাতে করে খুব সহজেই বীজগুলো গজাতে পারে এবং সুন্দর চারার সৃষ্টি হয়।

তো শিক্ষার্থী বন্ধুরা আমাদের আজকের এই পাঠ আলোচনা এই পর্যন্তই।  আশা করি তোমরা আজকের পাঠ আলোচনা থেকে অনেক উপকৃত হয়েছো। আবারো দেখা হবে নতুন কোন পাঠ আলোচনায়।  সে পর্যন্ত সবাই ভালো ও সুস্থ থাকবে এই কামনাই করি।

আল্লাহ হাফেজ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button