কৃষিশিক্ষা

এশীয় ও বিশ্ব-প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কৃষির তুলনা | কৃষি শিক্ষা | অষ্টম শ্রেনী

প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা কেমন আছো তোমরা।  আশা করি তোমরা সবাই অনেক ভালো ও সুস্থ্য আছো।  তো আবারো তোমাদের মাঝে চলে আসলাম নতুন একটি পাঠ আলোচনা নিয়ে। আজকে আমরা আলোচনা করবো “এশীয় ও বিশ্ব-প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কৃষির তুলনা” নিয়ে।  আশা করি তোমরা সম্পূর্ণ পাঠ আলোচনা মনযোগ সহকারে পড়বে এবং কিছু শিখার ও জানার চেষ্টা করবে। তো চলো শুরু করা যাক-

বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও ভিয়েতনাম এই চারটি দেশই এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত।  দেশগুলোর মধ্যে যেমন ভৌগোলিক দিক মিল রয়েছে  তেমনি কিছু মিল  বিদ্যমান থাকলেও কিছু অমিলও খুজে পাওয়া যায় । এই চারটি দেশেরই প্রধান ও সর্বাধিক কৃষি উৎপাদন হচ্ছে ধান এবং এই দেশগুলোর সাধারন  জনগনের  প্রধান খাদ্য  হচ্ছে ভাত । এদের মধ্যে চীন, ভারত ও বাংলাদেশ অত্যন্ত জনসংখ্যা বহুল দেশ। অবশ্য ভিয়েতনামে আয়তন অনুযায়ী কমই আছে ।

বাংলাদেশ ও চীন

বাংলাদেশের তুলনায় চীন কৃষিতে অনেক উন্নত। অনেক ক্ষেত্রেই কৃষিজাত উৎপাদনে চীন বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে আছে। চীন ধানের বংশগতির পরিবর্তন এমনভাবে ঘটাতে সক্ষম হয়েছে যে তাদের অধিকাংশ ধানের জাত আর মৌসুম নির্ভরশীল নেই। এই জাতগুলো পূর্বের প্রচলিত জাতগুলোর চেয়ে হেক্টর প্রতি সাতগুণ পর্যন্ত ফলন দিচ্ছে। চীনের ধান গবেষকগণ দাবি করছেন। আগামী প্রজন্মের ধান জাতগুলো এখনকার চাইতে দ্বিগুণ উৎপাদন দেবে। এই ‘সুপার হাইব্রিড’ ধানের একটি বড় ধরনের অসুবিধা হলো এই সকল অত্যাধুনিক ধানের বীজ সংরক্ষণ করা যায় না, এক প্রজন্মেই বীজের গুণাগুণ শেষ হয়ে যায়।

চীনের বর্তমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে এই সব ফসল হয়ত সহায়ক। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যা আছে। কারণ ঐতিহ্যগতভাবে ধান বীজের জন্য বাংলাদেশের চাষিদের বীজ ব্যবসায়ীদের মুখাপেক্ষী না হলেও চলে। কেননা দেশের মোট ব্যবহৃত ধান বীজের অন্তত ৮৫% চাষিরা নিজেরাই সংরক্ষণ ও ব্যবহার করে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট Bangladesh Rice Research Institute (BRRI) এ পর্যন্ত যতগুলো উচ্চ ফলনশীল ধান জাত High Yielding Variety (HYV) উদ্ভাবন করেছে সেগুলোর বীজ ধানক্ষেতেই উৎপাদন করা যায় এবং চাষিরা পরবর্তী ফসলের জন্য বীজ সেখান থেকে সংরক্ষণ করতে পারেন।

অর্থাৎ ধান বীজের জন্য বাংলাদেশের চাষিদের এক ধরনের সার্বভৌমত্ব রয়েছে। অবশ্য বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট সুপার হাইব্রিড ধান উৎপাদনের জন্য জোর গবেষণা চালাচ্ছে। শীঘ্রই হয়ত বাংলাদেশের চাষিরা এই অতি উচ্চ ফলনশীল দেশি ধান বীজ পাবে। তবে এই ধান উৎপাদনের অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশি চাষিরা রপ্ত করেছেন। কারণ কয়েকটি বীজ ব্যবসায়ী কোম্পানি এ ধরনের ধানের বীজ বাংলাদেশে চালু করতে আগ্রহী ছিল। এই প্রেক্ষিতে সরকার পরীক্ষামূলকভাবে সীমিত আকারে এ জাতীয় ধান উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছিল এই শর্তে যে, কোম্পানিগুলো দেশেই এই ধান বীজ উৎপাদন করবে।

বাংলাদেশের হাইব্রিড ধানের বড় যোগান দেশ কোনটি?

 উত্তর : চীন হলো  বাংলাদেশের হাইব্রিড ধানের বড় যোগান দেশ।

চীনের আধুনিক জাতগুলো আগের প্রচলিত জাতগুলোর তুলনায় বর্তমানে হেক্টর প্রতি কত গুণ ফলন দিচ্ছে? 

উত্তর : আগের প্রচলিত জাতগুলোর তুলনায় বর্তমানে হেক্টর প্রতি সাত গুণ ফলন দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ও ভারত

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। এ দেশের সঙ্গে আমাদের ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ও রয়েছে। কৃষির ক্ষেত্রে এই যোগাযোগ দুই দেশেরই ঐতিহ্যের অঙ্গ। দুইটি দেশই জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির দ্বারা সমস্যাগ্রস্ত। এই বিপুল দ্রুত বর্ধনশীল জনগোষ্ঠীর ক্ষুধা নিবারণের গুরুভার দেশ দুইটির কৃষক সমাজের উপর ন্যস্ত। ভারতের কৃষি বাংলাদেশের তুলনায় অনেক অগ্রসর। ধানসহ অন্যান্য শস্য, ডাল, ফুল ফল, শাক সবজি, ভোজ্য তেলবীজ, তুলা, আখ, পোল্ট্রি, ডেইরি, মৎস্য সহ প্রায় সকল কৃষিপণ্য উৎপাদনে ভারত বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে।

ভারতে রয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ডেইরি সমবায় প্রতিষ্ঠান, যা বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ। একই ইতিহাস ঐতিহ্যের অংশীদার হওয়ার পরও গত ষাট-সত্তর বছরে এই ব্যতিক্রমী পরিবর্তনের ধারা চলেছে। এর প্রধান দুইটি কারণের একটি হলো ভারতের কৃষক বাংলাদেশের কৃষকদের চেয়ে অনেক সংগঠিত; অপরটি হলো কৃষিবিজ্ঞান ও

প্রকৌশলে ভারতের অভূতপূর্ব অগ্রগতি। ভারতীয় বিজ্ঞানীরা শুধু ভারতের কৃষিকেই নয় বিশ্বের কৃষিকেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অবশ্য ভারতে কাজের ক্ষেত্রও বিশাল। বাংলাদেশের প্রায় আটাশগুণ বড় এই দেশটিতে কৃষি পরিবেশের বৈচিত্র্য একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ অপরদিকে ততোটাই সম্ভাবনাময়।

মরু অঞ্চল থেকে শুরু করে বরফাবৃত অঞ্চল, নিচু জলাভূমি থেকে শুরু করে পার্বত্য অসমতল ভূমি, অনুর্বর খরাপ্রবণ এলাকা থেকে নদীবিধৌত উর্বর অঞ্চলও রয়েছে। দেশের এক অঞ্চলে যখন তুষারস্নাত শীতকাল অন্য অঞ্চলে তখন গ্রীষ্ম বা বসন্তকাল। ফলে ভারতের সর্বত্র প্রায় সব ধরনের ফসল সারা বছরই উৎপাদিত হচ্ছে।

এত কিছুর পরও উভয় দেশের প্রায় সকল ফসলের জমির ইউনিট প্রতি গড় উৎপাদন কাছাকাছি। আবার ভারতের কিছু কিছু রাজ্য রয়েছে যেমন- পাঞ্জাব, হরিয়ানা বা কেরালা যেখানে ইউনিট প্রতি উৎপাদন অনেক বেশি। পাট, চামড়া, ইলিশ ইত্যাদি কিছু পণ্য ছাড়া প্রায় সব কৃষিপণ্য ভারত থেকে বাংলাদেশে রপ্তানি হয়। 

বাংলাদেশের আয়তনের থেকে ভারত কত গুন বড়? 

উত্তর : বাংলাদেশের আয়তনের থেকে ভারত ২৮ গুন বড়। 

বাংলাদেশ থেকে ভারতে সার্বাধিক রপ্তানি হয় কোন কোন পন্যগুলো?

উত্তর : সর্বাধিক রপ্তানি হয় এরকম ৩টি হলো :- পাট,ইলিশ ও চামড়া। তবে এছাড়াও আরো কিছু জিনিস রপ্তানি হয়।  তবে তা খুবই সল্প পরিমাণ।

বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম

বাংলাদেশের ও ভিয়েতনামের কৃষিতে বেশি মিল ধান উৎপাদনে। তবে এক্ষেত্রে দৃশ্যত ভিয়েতনামের কৃষকদের অগ্রগতি বাংলাদেশের চেয়ে দ্রুত হয়েছে। পঁচিশ বৎসর আগে যেখানে ভিয়েতনামের কৃষি উৎপাদন অনগ্রসর ও দুর্বল ছিল, তারা প্রায় সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে। এই গতি পাওয়ার প্রধানতম কারণ হলো ভিয়েতনামের কৃষক সমাজ অত্যন্ত সংগঠিত। ভিয়েতনামের কৃষি সমবায় সংগঠনগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী ও সৃজনশীল। সেখানকার সকল কৃষক কোনো না কোনো সমবায় সংগঠনের সাথে যুক্ত। কৃষি সমবায় সংগঠনগুলো এতো শক্তিশালী যে এরা স্থানীয় সরকারের বাৎসরিক ব্যয়ের অন্তত ৫০% যোগান দিয়ে থাকে। স্থানীয় কৃষি গবেষণা ও কৃষি সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তারা আর্থিক সহায়তা দেয়। এই সকল সংগঠন কৃষিনীতি ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কৃষিতে ভিয়েতনাম থেকে বেশ কিছু মাঠ প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে।

ভিয়েতনামের কৃষি সমবায় সংগঠনগুলোর স্থানীয় সরকারের বাৎসরিক আয়ের কত ভাগ যোগান দেয়?

উত্তর : একেক বছর একেক পরিমান হলেও গত কয়েক বছরের গড় হিসেব করলে দেখায় যায় ভিয়েতনামের কৃষি সমবায় সংগঠনগুলোর স্থানীয় সরকারের বাৎসরিক আয়ের শতকরা ৫০% ভাগ যোগান দেয়।

ভিয়েতনামের কৃষি উৎপাদন বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যাওয়ার তিনটি কারণ উল্লেখ কর।

উত্তর :

  1. কৃষি সমবায় সংগঠনগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী।
  2. কৃষক সমাজ সংঘটিত।
  3. কৃষি সমবায় সৃজনশীল।

ফসলের মৌসুম নির্ভরশীলতা  কাটিয়ে ওঠা 

ফসলের ক্ষেত্রে দিনের দৈর্ঘ্য সচেতনতা মৌসুম নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠার প্রধান কারণ। এই দিবাদৈর্ঘ্য সংবেদনশীলতা দূর করতে বা কমিয়ে দিতে পারলে অর্থাৎ একটি মৌসুম নির্ভর ফসলকে মৌসুম নির্ভরতামুক্ত করতে পারলে ফসলটি যে কোনো মৌসুমে উৎপাদন করা যায়।

উপযোগিতা:

বাজারে অসময়ের ফল ও সবজির চাহিদা খুবই বেশি। এসব অসময়ের ফসল উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। কৃষক ও খুচরা বিক্রেতা উভয়ে বাড়তি পয়সা উপার্জন করতে পারে।

উপযোগিতা

  1. বাজারে অসময়ের ফল ও সবজির চাহিদা খুবই বেশি। এসব অসময়ের ফসল উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। কৃষক ও খুচরা বিক্রেতা উভয়ে বাড়তি পয়সা উপার্জন করতে পারে।
  2. বিশেষ করে আগাম ফসল বাজারজাত করতে পারলে বেশি দাম পাওয়া যায়।
  3. ঋতুচক্র সংশিষ্ট কর্মহীনতা দূর করে কৃষককে মোটামুটি সারা বছর কর্মব্যস্ত রাখতে পারে।
  4. একই কারণে গ্রামীণ কর্মশক্তিকে সারা বছর কাজের নিশ্চয়তা দিতে পারে।
  5. মঙ্গা বা এই ধরনের সাময়িক দুর্ভিক্ষাবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।
  6. বাজারে কৃষিপণ্য বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করতে পারে।
  7. পুষ্টি সমস্যার সমাধান সহজতর করতে পারে।
  8. আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে এনে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হতে পারে।
  9. বিদেশি ক্রেতাদের সারা বছর কৃষিপণ্যের লভ্যতার নিশ্চয়তা দেওয়া যায়। ফলে কৃষিপণ্যের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো যায়।
  10. কৃষি গবেষণাকে মৌসুম নির্ভরতামুক্ত করা যায়।
জিএম  ফসলের GMC এর পূর্ণরূপ কি? 

উত্তর: genetical modified crop 

জেনেটিক্যাল মডিফাইড ক্রপ

ফসলের ক্ষেত্রে  মৌসুম নির্ভরশীলতার প্রধান কারণ কোনটি? 

উত্তর : দিবা দৈর্ঘ্য সংবেদনশীলতা । 

তো শিক্ষার্থী বন্ধুরা আমাদের আজকের এই পাঠ আলোচনা এই পর্যন্তই। আশা করি তোমরা আজকের পাঠ আলোচনা থেকে অনেক কিছু শিখতে ও জানতে সক্ষম হয়েছো।  আমাদের আবার দেখা হবে নতুন কোন পাঠ আলোচনায়।  সে পর্যন্ত সবাই ভালো ও সুস্থ থাকবে এই কামনাই করি।

আল্লাহ  হাফেজ!

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button